হাজারীলেনের ২৫ গোপন আস্তানায় নকল ওষুধের হাজার কোটির সাম্রাজ্য, নেপথ্যে গণি-শিবু চক্র!

সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ হবে শীঘ্রই...

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৫:২৮

রোগ নিরাময়ের শেষ ভরসা যে ওষুধ, ল্যাবরেটরির বিষাক্ত মানদণ্ডে তা যখন রূপ নেয় মরণফাঁদে-তখন সেটিকে আর বাণিজ্য বলা চলে না, তা হয়ে দাঁড়ায় প্রাতিষ্ঠানিক নরহত্যা।

পুরান ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও মিটফোর্ড থেকে শুরু করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের হাজারী গলি পর্যন্ত দীর্ঘ চার দশক ধরে পেশাদারিত্বের আড়ালে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অপরাধ চক্র।

ক্ষমতার মসনদে রদবদল হলেও সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ও জীবন বাজি রেখে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই নীল নকশা থামেনি।

২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক খোলস বদলে আরও ধূর্ততার সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগে বিস্তার লাভ করেছে এই বিষাক্ত বলয়।

ক্ষমতার ছায়াতলে দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেট

অনুসন্ধানে স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগে জানা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবৈধ ড্রাগ কারবারের একক আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি (বিসিডিএস) চট্টগ্রাম শাখার সাবেক সভাপতি নুরুল গণি (আবদুল গণি চৌধুরী) এবং হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি শিবু প্রসাদ।

এই প্রধান দুই কারিগরের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ওয়াসিম, রাশেদ ও মইনুলসহ প্রায় ২০ জনের এক অপরাধী গোষ্ঠী।

বিসিডিএসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাইনুল হক চৌধুরী ও চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাবেক সভাপতি নুরুল গণির অনৈতিক যোগসাজশে কোনো প্রকার সাধারণ সভা (এজিএম) বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়াই একতরফাভাবে একটি ‘পকেট কমিটি’র মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সাধারণ ব্যবসায়ীরা যাকে ‘গায়েবি ও অবৈধ কমিটি’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেদের পরিচয় পুনর্গঠন করে এবং লালদীঘিস্থ বিসিডিএস জেলা কার্যালয় বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে বলপূর্বক দখলের পাঁয়তারা চালাচ্ছে এই চক্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাজারী লেনের এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, একটি মর্যাদাপূর্ণ সংগঠনকে ব্যক্তিগত ক্লাবে রূপান্তর করা হয়েছে।

বিসিডিএসের মতো পেশাজীবী সংগঠনের রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল বানিয়ে তারা কায়েম করেছে ত্রাসের রাজত্ব।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই মেলে প্রাণনাশের হুমকি। আমরা এই অবৈধ কমিটি এবং অসাধু সিন্ডিকেটের হাত থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মুক্তি চাই।

হাজারী লেনে ২৫ গোপন আস্তানা ও ‘শান্তি সার্জিক্যাল’ কাণ্ড

চট্টগ্রামের ওষুধ বিপণনের হৃদপিণ্ড ‘হাজারী লেন’ এখন এক নীরব আতঙ্কের আস্তানা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ড্রাগ প্রশাসনের দৃষ্টি এড়াতে পুরো এলাকা জুড়ে চক্রটির অন্তত অর্ধশতাধিক চোরাই গোডাউন রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবী, এর মধ্যে কেবল গণি ও শিবু প্রসাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে ২৫টিরও বেশি গোপন আস্তানা, যেখানে বিপুল পরিমাণ আমদানি-নিষিদ্ধ, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও গুণমানহীন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ মজুদ রাখা হয়।

গত ৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে শিবু প্রসাদের মালিকানাধীন ‘শান্তি সার্জিক্যাল’ এ নকল স্ট্রিপ বিক্রির সময় শিবু প্রসাদ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাতে নাতে ধরা পড়েন।

তবে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিসিডিএস সভাপতি নুরুল গণি অভিযুক্ত শিবুকে দায়মুক্তি দেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

জিম্মি সহস্রাধিক ব্যবসায়ী ও হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য

হাজারী লেনের প্রায় এক হাজার ঐতিহ্যবাহী ও সাধারণ ওষুধ ব্যবসায়ী দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এই চক্রটির কাছে জিম্মি।

মুখ খুললেই নেমে আসে সন্ত্রাসী হামলা কিংবা প্রাণনাশের হুমকি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, এখানে ব্যবসার কোনো পরিবেশ নেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই ভাড়াটে খুনি বাহিনী দিয়ে হয়রানি করা হয়।

চোখের সামনে ওষুধ নামের বিষ বিক্রি হতে দেখছি, কিন্তু জীবনের ভয়ে টু শব্দটিও করতে পারি না।

২৪-এর ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত পলাতক আসামি হওয়া সত্ত্বেও শিবু প্রসাদ বহাল তবিয়তে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।

অভিযোগ রয়েছে, নুরুল গণি চৌধুরী এবং গত ৫ আগস্টের পর পুনর্বাসিত কিছু নব্য বিএনপি কর্মীর মদদে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তদারকির অভাব ও প্রশাসনের একাংশের নীরবতার সুযোগে মইনুল, গণি ও শিবু প্রসাদ গড়ে তুলেছেন হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সাম্রাজ্য, যা দিয়ে তারা নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী লালন-পালন করছেন।

অভিযোগের সত্যতা যাঁচাইয়ে গণি ও শিবুর সাথে যোগোযোগে একাধিকবার চেষ্টা করেও কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে মন্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

সিএমপি কমিশনারের দ্বারে সংক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা

দীর্ঘদিনের জিম্মিদশা ও কার্যালয় জবরদখলের আশঙ্কায় অবশেষে সোচ্চার হয়েছেন হাজারী লেনের সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

সম্প্রতি সিন্ডিকেট ভাঙা, অবৈধ কমিটি বাতিল এবং অসাধু চক্রের দমনের দাবিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।

অভিযোগপত্রে স্বাক্ষরকারী আট ব্যবসায়ী নেতা হলেন, আলমগীর নূর (নন্দন ফার্মা), আশীষ কুমার চৌধুরী (মেসার্স রোগমুক্তি ফার্মেসী), বিকাশ কান্তি সিংহ (মোহসেন আওলিয়া ফার্মেসী), দীলিপ কুমার সুশীল (অংকন মেডিকো), তপন বৈদ্য (ছবি মেডিকো), জয়নাল আবেদীন (আলিফ ড্রাগ হাউজ), শ্যামল চৌধুরী (অমিয় ফার্মেসী) ও মোঃ লোকমান হোসেন (ফার্স্ট এইড ফার্মেসী)।

সিএমপি কমিশনারের পাশাপাশি বিষয়টি অবহিত করে আশু হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, র‍্যাব-৭ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।

জনস্বাস্থ্যে চরম ঝুঁকি: অবিলম্বেই দরকার যৌথ অভিযান

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভুয়া ও ভেজাল ওষুধ গ্রহণের ফলে রোগীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে এবং কিডনি ও লিভার বিকল হয়ে হঠাৎ মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

চিকিৎসা নিতে গিয়ে নাগরিক যখন প্রতিষেধকের নামে বিষ পান করেন, তখন রাষ্ট্রীয় তদারকি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা শূন্যে ঠেকে।

সাধারণ ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল অবিলম্বে কয়েকটি দাবি জানিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, পলাতক আসামি শিবু প্রসাদ ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার। ‘শান্তি সার্জিক্যাল’ ও ‘শান্তি ফার্মেসী’সহ শিবুর মালিকানাধীন সব দোকান এবং গোপন ১৫-২০টি গোডাউন সিলগালা করা।

সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে হাজারী লেনে চিরুনি অভিযান পরিচালনা এবং অবৈধ বিসিডিএস কমিটি বিলুপ্ত করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে এখনই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিহ্নিত গডফাদারদের দ্রুত গ্রেপ্তার, তাদের গোপন গোডাউনগুলোতে সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর সমন্বিত অভিযান এবং অবৈধ কমিটি বিলুপ্ত না করা হলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধসে পড়বে।

বি: দ্র: ধারাবাহিক সিরিজের পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করা হবে কীভাবে নামমাত্র মূল্যে অফিস ভাড়া নিয়ে মাত্র এক মাসের ভাড়া পরিশোধের পর প্রায় চল্লিশ বছর ধরে দখলে রয়েছে বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি (বিসিডিএস) চট্টগ্রাম শাখার কার্যালয়, দখলবাজে কারা জড়িত এবং তাদের ক্ষমতা ও আয়ের উৎস। সব থাকবে সিরিজের দ্বিতীয় প্রতিবেদনে।  

 চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি