অজুহাতের বাণিজ্য ও নীরব সরকার: সয়াবিনের আগুনে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা!

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ১৯:১১

চাল ও সবজির বাজারের আগুনে এমনিতেই সাধারণ মানুষের হাঁড়ির অবস্থা করুণ। বন্যার অশুভ ছায়াকে মূলধন করে একশ্রেণির ব্যবসায়ী যখন নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী করে তুলেছেন, ঠিক তখনই নতুন করে আঘাত হানা হয়েছে ভোজ্যতেলের বাজারে।

আন্তর্জাতিক বাজারের দরপতনের খবর চেপে গিয়ে, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আবারও সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে গুটিকয়েক আমদানিকারক সিন্ডিকেট।

ভোক্তাদের চরম সংকটে ফেলে জনগনের পকেট কাটার এই উৎসবকে সরকারের জন্য বড় ধরণের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকেত হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক বাজারে যখন ভোজ্যতেলের দাম বাড়ে, দেশের ব্যবসায়ীদের সেটির বাস্তবায়নে মুহূর্তও দেরি হয় না। অথচ বিশ্ববাজারে দরপতন হলে সেই তথ্য তাদের স্মরণে থাকে না।

অতিসম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কিংবা ইরান যুদ্ধকে অজুহাত বানিয়ে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর যে পাঁয়তারা চলছিল, তা জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করায় সাময়িকভাবে সফল হয়নি।

কিন্তু সেই চক্রান্ত থেমে থাকেনি; আবারও নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে সরকারের টেবিলে।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন এই পরিস্থিতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, দেশের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে খাদ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেওয়া হলেও সেখানে দাম কমলে আমাদের ব্যবসায়ীদের তা মনে থাকে না।

সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর জন্য তারা অনেক দিন ধরে ওত পেতে ছিল। ইরান যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এবার তারা নতুন করে প্রস্তাব দিয়েছে।

বাজারে এই অস্থির সময়ে সরকারকে বিব্রত করতে গুটিকয়েক আমদানিকারক কারসাজি করে জনগণের পকেট কাটার পাঁয়তারা করছে।

ভোজ্যতেলের এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে না, এটি নিঃশব্দে ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে। দাম বাড়ার কারণে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খোলা, নিম্নমানের এবং বারrepeatedly ব্যবহৃত (পোড়া) তেল ক্রয় করছে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত মূল্যের কারণে বাজারে ভেজাল তেলের বিক্রি বহুগুণ বেড়ে যায়।

পোড়া তেল এবং অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ব্যবহারের ফলে মানুষের দেহে অনিয়ন্ত্রিত ট্রান্স-ফ্যাট প্রবেশ করে, যা সরাসরি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

স্বল্প আয়ের মানুষ পুষ্টিকর খাবার ছাঁটাই করে তেলের বাজেট মেলাতে গিয়ে চরম পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে।

নিত্যপণ্যের বাজারের সার্বিক তদারকি ও দায়ভার একপ্রকার ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে সরকারের নীরব ভূমিকা পালনকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছে ক্যাব। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃশ্যমান কোনো শক্ত পদক্ষেপ না থাকায় ব্যবসায়ীরা একপ্রকার ‘লাঘমহীন স্বাধীনতা’ বা ফ্রিস্টাইল সংস্কৃতি তৈরি করেছে।

এস এম নাজের হোসাইন সতর্ক করে বলেন, এমনিতেই সরকার নিত্যপণ্যের বাজারের পুরো দায়ভার ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা যেভাবে চাইছে সেভাবেই সবকিছু ঘটছে, সেখানে সরকার নীরব। নতুন করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলে তা সাধারণ মানুষের জন্য হবে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’।

ব্যবসায়ীদের এই ফ্রিস্টাইলে দাম বাড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে সরকারকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে। তা না হলে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

জরুরি তদন্তের দাবি

সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। চাল, সবজি থেকে শুরু করে সয়াবিন তেল-প্রতিটি নিত্যপণ্যের বাজারে যে সিন্ডিকেট রাজত্ব করছে, তাদের ক্ষমতার উৎস কোথায়, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের স্পষ্ট দাবি, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমদানিকারক ও মিলমালিকদের এই কারসাজির পেছনে কারা জড়িত, তা উদঘাটনে অবিলম্বে একটি স্বাধীন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জমে থাকা এই অসন্তোষ ও ক্ষোভযন্ত্রণার বিস্ফোরণ সামাজিক স্থায়িত্ব ও আইনশৃঙ্খলার জন্য এক বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি