যে হাতে আবার পবিত্র কোরআন তুলে নেওয়ার কথা ছিল, বেলা ১১টায় মায়ের সাথে যে পায়ের হেঁটে যাওয়ার কথা ছিল মাদ্রাসার আঙিনায়-সব পরিকল্পনা থমকে গেল এক নিমেষে।
ছুটি শেষে প্রিয় দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে ফেরার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে রাজখালী খালের এক বুক পানিতে নিভে গেল ১২ বছরের এক পুঁচকে হাফেজের জীবনপ্রদীপ।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের খতিবনগর এলাকায় শনিবার সকালে ঘটে গেছে এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা।
নিহত সোনামণির নাম মুহাম্মদ মিনহাজ (১২)। সে ওই এলাকার মুহাম্মদ ইব্রাহিমের আদরের সন্তান এবং ইসলামপুর তৈয়্যবিয়া তাহেরিয়া ছত্তারিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের এক অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে বাড়িতে নিজের বাইসাইকেলটি রেখে এক বন্ধুর সাথে একটু হাঁটার উদ্দেশ্যে বের হয় মিনহাজ।
রাজখালী খালের পাড় ঘেঁষে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই অসাবধানতাবশত পা পিছলে গভীর পানিতে পড়ে যায় সে। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে পেছনের দিকে তাকাতেই মিনহাজকে পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে আঁতকে ওঠে সাথে থাকা ছোট বন্ধুটি।
তার অবোধ চিৎকার ও কান্নাকাটিতে ছুটে আসেন খালের আশপাশের লোকজন।
তড়িঘড়ি করে খাল থেকে মিনহাজকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় নিকটস্থ রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
কিন্তু সেখানকার জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মিনহাজকে মৃত ঘোষণা করেন। মুহূর্তের মধ্যেই স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের বাতাস।
পরিবার ও মাদ্রাসা সূত্র জানায়, মাত্র তিন দিন আগেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় মা গিয়ে মিনহাজকে মাদ্রাসা থেকে সাময়িক ছুটি নিয়ে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।
একটু সুস্থ বোধ করায় শনিবার বেলা ১১টার দিকে তাকে আবারও মাদ্রাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, বেলা ১১টা বাজার আগেই, সকাল ৯টায় খালের নোনা পানিতে ডুবে সব স্বপ্নের ইতি ঘটে।
মাদ্রাসার সুপার মাওলানা নুরুল আলম আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, মিনহাজ কেবল এক শান্ত ও বিনয়ী শিশুই ছিল না, সে ছিল অসম্ভব মেধাবী। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই পরম মমতায় পবিত্র কোরআনের চার পারা মুখস্থ (হিফজ) করে ফেলেছিল সে। ওর এমন আকস্মিক ও করুণ বিদায় আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।
মৃত্যুর পর মিনহাজের নিথর দেহ স্বজনরা বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে চাইলে আইনি প্রক্রিয়ার কারণে রাঙ্গামাটি কোতোয়ালি থানা পুলিশ মরদেহটি সাময়িকভাবে আটকে রাখে। এতে শোকাহত ও দিশেহারা পরিবারটি স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা কামনা করে।
পরবর্তীতে নেতৃবৃন্দ বিষয়টির জটিলতা নিরসনে রাঙ্গুনিয়া থানাকে অবহিত করলে, দুপুর ১টার দিকে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনার স্থান ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা তদন্তে রওনা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ জহির উদ্দিন জানান, খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্ত শেষে পরবর্তী উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
একটি নিষ্পাপ প্রাণ, চার পারা কোরআনের স্মৃতি আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে চিরতরে হারিয়ে গেল রাজখালী খালের বুক থেকে।
পরিবার আর মাদ্রাসার করিডোরে এখন শুধুই মিনহাজের অনুপস্থিতির নীরব কান্না।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


