সরকারি হিসাবের ৩৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও অডিট আপত্তির গুরুতর অভিযোগ দাপ্তরিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। বিধি অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের (Dismissal) গুরুদণ্ডও দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বরখাস্তের আদেশ টিকল না দুই সপ্তাহও।
অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আজিজুল ইসলামের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বরখাস্ত হওয়া ওই কর্মকর্তাকে শর্তসাপেক্ষে পুনর্বহাল করা হয়েছে।
নজিরবিহীন এই প্রশাসনিক অনুকম্পায় বিএডিসির চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে এবং সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সংস্থাটির প্রাক্তন গুদামরক্ষক ও বর্তমানে মধুপুর ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম খলিল।
নথিপত্র ও দাপ্তরিক সূত্র অনুযায়ী, বিগত ২০২৪-২৫ বিতরণ বর্ষে রাঙ্গামাটি বীজ বিপণন দপ্তরে থাকাকালে বোরো ধানবীজ বিক্রির ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ টাকা সরকারি ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৫০১ টাকার পৃথক অডিট আপত্তিও রয়েছে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাঙ্গামাটিতে কর্মকালীন বিক্রি করা ধানের টাকা দ্রুত সরকারি হিসাবে স্থানান্তরের জন্য বিএডিসি চট্টগ্রাম অঞ্চলের যুগ্মপরিচালক এবং রাঙ্গামাটির উপপরিচালক দপ্তর থেকে ছয়টি পৃথক স্মারকে ইব্রাহীম খলিলকে তাগাদা দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ উপেক্ষা করে অর্থ জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।Link-আজকের সংবাদ
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৫ মে বিএডিসি ঢাকার উপব্যবস্থাপক (বীজ বিতরণ) মোজাদ্দেদ নাজির হোসেন রাঙ্গামাটি কার্যালয় পরিদর্শন করে চূড়ান্ত হিসাব পর্যালোচনা করেন।
তদন্তে ৩৬ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ টাকা অজমাকৃত থাকার সত্যতা মেলে। একই সঙ্গে গুদামের গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও হিসাব বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত হয়।
পরপর দুটি ব্যাখ্যা তলবের পর অভিযুক্ত ইব্রাহীম খলিল ২৯ জুন ও ২০ জুলাই দুই দফায় মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিলেও বাকি ২৯ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকা অনাদায়ি থেকে যায়।
পরবর্তীতে বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯০-এর প্রবিধি ৩৯ (ক), (খ) ও (চ) অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ ও আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (নং ১২/২০২৫) করা হয়।
ঢাকার সেচ ভবনের যুগ্মপরিচালক ড. মো. মাহবুবুর রহমান তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিরপেক্ষ তদন্ত চালিয়ে আনীত সব অভিযোগ সত্য বলে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় এবং দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশ শেষে সংস্থাপন বিভাগের ৭ জুন ২০২৬ তারিখের আদেশে ইব্রাহীম খলিলকে চাকরি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
নাটকীয় পুনর্বহাল ও রাজনৈতিক ছায়া
কিন্তু বরখাস্তের পরপরই ঘটনার চিত্র বদলে যায়। বিএডিসির উপ-সচিব আবু জাফর রাশেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠির সূত্রে জানা যায়, বরখাস্ত হওয়ার পর ইব্রাহীম খলিল টাকা ফেরতের অঙ্গীকার ও ‘ভুল স্বীকার’ করে আবেদনের নাটকীয়তায় পুনর্বহাল পান।
অভিযোগ উঠেছে, বিএনপি সমর্থক দক্ষিণাঞ্চলের এক নেতার নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং বিএডিসির চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলামের প্রত্যক্ষ মদদে এই পুনর্বহালের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংস্থাপন বিভাগের ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখের আদেশে তার বরখাস্তের দণ্ড পরিবর্তন করে কেবল ‘তিরস্কার’ লঘুদণ্ড দিয়ে চাকরিতে ফেরানো হয়।
পুনর্বহালের শর্ত অনুযায়ী, অবশিষ্ট ২৯ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা ৩০ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে এককালীন জমা এবং বাকি ২৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ টাকা পুনর্বহালের পর তার মূল বেতনের ৫০ শতাংশ (অর্ধেক) হারে প্রতি মাসে কেটে সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রশাসনিক ভেঙে পড়া ও তদন্তের দাবি
বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ফৌজদারি অপরাধ সমতুল্য অর্থ আত্মসাতের দায়ে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাবে কয়েকদিনের মধ্যে ফিরে আসেন?
এতে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং সৎ কর্মকর্তারা হতাশ হচ্ছেন। সংস্থাটির চেইন অব কমান্ড বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
প্রশাসনিক বিষেশজ্ঞরা বলছেন, সরকারি অর্থ আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত কোনো কর্মচারীকে কেবল ‘টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি’ ও ‘তিরস্কার’ দিয়ে পুনর্বহাল করা বিপজ্জনক পূর্বদৃষ্টান্ত। এতে সরকারি তহবিলের সুরক্ষার আইনি ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
অভিযোগের বিষয়ে বিএডিসির চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে বারবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বিএডিসির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার স্বার্থে এই অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংস্থাটির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


