চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ১৭ নং খরনা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মুজাফরাবাদ গ্রাম। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দীর্ঘ পরিক্রমায় গ্রামটি নিজস্ব স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হলেও রাতের আঁধারে গ্রামীণ জনপদে চলাফেরা করা ছিল এক প্রকার বিড়ম্বনা।
বিশেষ করে গত প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় পশ্চিম পাড়ার সংযোগ সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় নারী, শিশু, প্রবীণ এবং রাতের পথচারীদের পড়তে হতো চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
সেই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অন্ধকার আর শঙ্কাকে পেছনে ফেলে এখন আলোর মিছিলে মুখরিত এই জনপদ।
প্রায় ৫২ বছরের পুরনো স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘সবুজ সংঘ’এর উদ্যোগে দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার সড়কজুড়ে বসানো হয়েছে দৃষ্টিনন্দন আধুনিক সড়কবাতি।
৭ নং পশ্চিম মুজাফরাবাদ সেন বাড়ির স্টিল ব্রিজ থেকে শুরু করে বণিক পাড়ার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত-পুরো পথজুড়ে প্রায় অর্ধশতাধিক বাতি স্ট্যান্ডসহ স্থাপন করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে।
টানা কয়েক দিনের স্বেচ্ছাশ্রম ও কর্মযজ্ঞে এই আয়োজনে ব্যয় হয়েছে লক্ষাধিক টাকা। এই মহতী উদ্যোগে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন এলাকাবাসী, আর ধন্যবাদের জোয়ারে ভাসছেন ক্লাবের সভাপতি সঞ্জয় নন্দী ও সাধারণ সম্পাদক রানা সেনসহ সকল নেতৃবৃন্দ ও সদস্যবৃন্দ।
সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাতেরবেলা নিরাপত্তা জোরদার করা এবং গ্রামীণ যাতায়াত সহজ করার তাগিদ থেকেই এগিয়ে আসে ‘সবুজ সংঘ’।
সংগঠনের তরুণরা প্রমাণ করেছেন, কেবল ইট-পাথরের উন্নয়ন নয়, মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি।
নিজেদের পকেট থেকে অর্থায়ন এবং স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে তারা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা পুরো মুজাফরাবাদ গ্রামের যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করার মতো এক অনুকরণীয় সামাজিক দায়িত্ববোধ।
সবুজ সংঘ ক্লাবের সভাপতি সঞ্জয় নন্দী জানিয়েছেন, সড়কবাতি সংযোজনের এই কর্মযজ্ঞটি ছিল বেশ সুপরিকল্পিত। ৭ নং পশ্চিম মুজাফরাবাদ সেন বাড়ির স্টিল ব্রিজের মতো জনবহুল ও ব্যস্ত পয়েন্ট থেকে শুরু করে বণিক পাড়ার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পুরো পথটিকে সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।
একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রানা সেন জানিয়েছেন, রাতের বেলা যেন কোনো ছিনতাই, দুর্ঘটনা বা অনভিপ্রেত ঘটনা না ঘটে, সেজন্য প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে শক্তিশালী বাতি ও স্ট্যান্ড।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল এই সড়কটিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করার। রাতের বেলা জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ে বাড়ি ফেরার পথে যে আতঙ্ক কাজ করত, এই সড়কবাতি সংযোজনের ফলে তা চিরতরে দূর হয়েছে।
এখন রাতের নীরব সড়কে যখন একসঙ্গে অর্ধশতাধিক বাতি জ্বলে ওঠে, তখন পুরো এলাকাজুড়ে এক নান্দনিক ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
গ্রামের প্রবীণ থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে এখন একটাই আলোচনা-সবুজ সংঘের এই অসামান্য উদ্যোগ।
বাংলাদেশ গীতা শিক্ষা কমিটি (বাগিশীক) চট্টগ্রাম মহানগরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সনাতন ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক বনগোপাল চৌধুরী মহৎ উদ্দ্যেগে সবুজ সংঘ ক্লাবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আমাদের এই পশ্চিম পাড়ার রাস্তা দিয়ে রাতের বেলা চলাচল করা এক সময় বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় টেনশন হতো। সবুজ সংঘ যেভাবে নিজেদের উদ্যোগে পুরো রাস্তায় বাতি জ্বালালো, তাতে আমাদের দীর্ঘদিনের একটি বড় দুর্ভাবনা দূর হলো।
পশ্চিম মুজাফরাবাদ ৭ নং ওয়ার্ড এর ইউপি সদস্য খোকন চৌধুরী বলেছেন, বণিক পাড়া থেকে স্টিল ব্রিজ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সড়কে আলোর ব্যবস্থা করা চাট্টিখানি কথা নয়।
ক্লাবের ছেলেরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে এই কাজ বাস্তবায়ন করেছে। এলাকার নিরাপত্তা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ক্লাবের সকল সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী প্রিয়া সেন বলেছেন, সন্ধ্যার পর কোচিং বা টিউশনি থেকে ফেরার সময় এই অন্ধকার রাস্তাগুলো পার হতে ভয় লাগত।
এখন পুরো রাস্তায় বাতি জ্বলার কারণে মনে হয় শহরের কোনো এলাকার মধ্য দিয়ে হাঁটছি। আমাদের ক্লাবের ভাইদের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ বলেন, রাতে বাড়ির বাইরে বের হলে চারপাশ একদম অন্ধকার থাকত। এখন ঘরের দরজা খুললেই আলো ঝলমলে রাস্তা দেখা যায়। বুকভরা স্বস্তি নিয়ে এখন রাতেও চলাচল করা যাচ্ছে।
সমাজ সেবক ও ব্যবসায়ী সজল সেন বলেন, আমাদের গ্রামের ছেলেরা যে এমন সুন্দর একটা কাজ করতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস হতো না। মোড়ে মোড়ে বাতি লাগানোর কারণে রাতের বেলা চোর-ডাকাতের ভয়ও অনেক কমে গেছে। সবার পক্ষ থেকে ওদের অনেক আশীর্বাদ জানাই।
তরুণ সমাজকর্মী ও ক্লাবের উপদেষ্টা রিটন বিশ্বাস বলেন, সবুজ সংঘ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক বিভিন্ন ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত আছে। তবে এই সড়কবাতি লাগানোর কাজটি আমাদের গ্রামের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। তরুণদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা যে সমাজ বদলাতে পারে, এটি তার বড় প্রমাণ।
প্রবাসী রাজীব মালাকার বলেছেন, প্রবাসে থেকেও যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখি আমাদের গ্রামের রাস্তাগুলো আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে, তখন বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। সভাপতি সঞ্জয় নন্দী এবং সাধারণ সম্পাদক রানা সেনসহ ক্লাবের সবার প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
একটি জনপদের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সার্থক হয়, যখন সেখানকার মানুষ নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক জীবনযাপন করতে পারে। পটিয়ার মুজাফরাবাদ গ্রামের ‘সবুজ সংঘ’-এর এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজেদের সামর্থ্য আর সদিচ্ছা দিয়েও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


