ভুয়া বিলের নয়ছয়: দুদকের মামলায় রেল, চসিক ও ব্যাংকের ১৪ জন আসামি!

রেলওয়ের প্রায় ১ কোটি টাকা জালিয়াত চক্রের পকেটস্থ!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাতের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে।

ভুয়া বিল তৈরি, জালিয়াতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও সীমান্ত ব্যাংকের ১৪ জন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি দায়ের করেন সংস্থাটির উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন।

এই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ঘটনায় প্রশাসনিক নজরদারি এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিকে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সুকৌশলে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।

‘মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের চারটি বৈধ বিলের বাইরে অতিরিক্ত ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার একটি সম্পূর্ণ ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ পরিশোধ করা হয়।

২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই বিপুল পরিমাণ অর্থের চেক ইস্যু করা হয় এবং পরদিনই তা সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় সংশ্লিষ্ট ভুয়া হিসাব নম্বরে জমা দিয়ে পুরো অর্থ তুলে নেওয়া হয়।

অথচ রেলওয়ে দপ্তরের বিল রেজিস্টার বা অন্য কোনো দাপ্তরিক নথিতে এই কথিত বিলটির কোনো বৈধ এন্ট্রি বা অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়ম ও মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। চসিক থেকে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ এবং সীমান্ত ব্যাংকে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ‘কোহিনুর আক্তার’ নামের এক নারীর ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃত কোহিনুর আক্তার একজন সাধারণ শ্রমিক এবং তিনি এই ব্যবসা ও ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন।

একইভাবে, ‘দি কসমোপলিটন করপোরেশন’-এর প্রকৃত মালিকও এই লেনদেন ও তথ্যের বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং অভিযুক্তদের কাউকেই চেনেন না বলে জানিয়েছেন।

জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, স্বাক্ষর এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় স্পষ্ট অসংগতি ও সন্দেহ থাকার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও দপ্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিল পাস ও চেক ছাড়ের ব্যবস্থা করেন।

রেলওয়ের নথিপত্র প্রস্তুত থেকে শুরু করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং অর্থ উত্তোলনের প্রতিটি ধাপে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও স্বচ্ছতার মূলে বড় ধরনের কুঠারঘাত।

মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন রেলওয়ের অস্থায়ী কর্মচারী মো. হাবিবুল্লাহ খান, সাবেক অডিটর পবন কুমার পালিত, জুনিয়র অডিটর মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে, হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেন, হিসাবরক্ষক সৈয়দ মো. সাইফুর রহমান, হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছের এবং অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান।

চসিকের পক্ষ থেকে আসামি করা হয়েছে লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপন পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপকর কর্মকর্তা এম. মনজুর উদ্দিন চৌধুরী ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে।

এ ছাড়া সীমান্ত ব্যাংক পিএলসির সাবেক কর্মকর্তা মো. পারভেজ, রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া এবং সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ারকে এই জালিয়াতিতে সহযোগিতার অভিযোগে আসামি করা হয়েছে।

দুদকের উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন জানান, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের এই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে যাদের শনাক্ত করা যায়নি, তদন্তে তাদের প্রকৃত পরিচয় এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তাও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি