ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার পর এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান আলোচ্য বিষয়—নতুন সরকার গঠন ও সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসন পেয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারা। বিএনপির এই মন্ত্রিসভায় কারা স্থান পাচ্ছেন, সবার নজর এখন সেদিকে।
এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে জোরালো আলোচনা। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পরই মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষণ গণনা শুরু হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে। ৩০০ আসনের সংসদে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১টি আসন। ইতোমধ্যে দুই শতাধিক আসনে জয় নিশ্চিত করে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।
দলীয় ঘোষণানুযায়ী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। নির্বাচনের আগেই দলীয়ভাবে তার নেতৃত্বে সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
বিএনপি নেতারা মনে করেন, সাংবিধানিকভাবেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানো হবে। তাঁরা আশা করছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যেই শপথ পড়ানো হবে এবং দেশবাসী নতুন সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি নতুন মন্ত্রিপরিষদ দেখতে পাবে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটায় অনির্বাচিত বিশেষজ্ঞ ও জোটসঙ্গীদেরও অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে।
দলীয় কার্যালয় ও শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনায় ইতোমধ্যে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নাম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই দৌড়ঝাঁপ করছেন, যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে।
নতুন মন্ত্রিসভার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক যে যাত্রা শুরু হলো, তা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। সব রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং সংবিধানের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক সংস্কার করা হবে—এটা আমাদের লক্ষ্য ছিল।’
তিনি বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই আমরা আমাদের ইশতেহার প্রণয়ন করেছি। এর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে। এই রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল আমরা অক্ষর অক্ষরে পালন করব।’
কেমন হতে পারে মন্ত্রীসভা?
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলে তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হবেন। নতুন সরকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যাচ্ছেন—এ বিষয়ে জোরালো আলোচনা রয়েছে।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিবিসি বাংলা এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোর বরাত দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবারের দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের দ্বিতীয় প্রধান খবর— Fresh faces and old guards: BNP to blend continuity with change in new cabinet; অর্থাৎ বিএনপির নয়া মন্ত্রিসভায় পুরোনোদের পাশাপাশি থাকছে নতুন মুখ।
প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিএনপি তাদের মন্ত্রিসভার আকার প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তাতে অভিজ্ঞ ও তরুণ, নির্বাচিতদের পাশাপাশি টেকনোক্রেট কোটায়ও যুক্ত হচ্ছেন কেউ কেউ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতির জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। স্পিকার হিসেবে ড. আব্দুল মঈন খান, মির্জা আব্বাসকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, সালাহউদ্দিন আহমদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং আ ন ম এহসানুল হক মিলন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকেও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনাধীন।
এ ছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে স্থায়ী কমিটি এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নাম বিবেচনা করা হচ্ছে।
নতুন মন্ত্রিসভায় নয়া মুখ হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে রুহুল কবির রিজভী (টেকনোক্র্যাট), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ইসমাইল জবিউল্লাহ (টেকনোক্র্যাট), হুমায়ুন কবির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানির নাম বিবেচনায় আছে।
জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান বর্ষীয়ান নেতা মোস্তফা জামাল হায়দারকেও (টেকনোক্রেট কোঠায়) মন্ত্রীসভায় দেখা যেতে পারে।
চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন ও আইনজীবী ফজলুর রহমানও আলোচনায় রয়েছেন।
আলোচনায় রয়েছে, এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, ড. রেজা কিবরিয়া, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে নির্বাচিত মীর হেলাল, চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী-খুলশী) আসনে নির্বাচত সাইদ আল নোমান ও মোস্তফা জামাল হায়দারের নামও।
এ ছাড়া নতুন মন্ত্রিসভায় থাকছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ।
এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, জহিরউদ্দিন স্বপন, রেজা কিবরিয়া, রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, শরীফুল আলম, দেওয়ান সালাহউদ্দিন, হাবিবুর রশিদ হাবিব, সেলিম ভূঁইয়া, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান আসাদ, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, শামা ওবায়েদ, ফারজানা শারমিন পুতুল, ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, আসাদুল হাবীব দুলু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, রকিবুল ইসলাম বকুল আলোচনায় আছেন।
এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ-৬ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি প্রার্থী প্রফেসর ড. এম এ মুহিত, খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত বিএনপি প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটি ও বান্দরবান আসন থেকে নির্বাচিত দুজনের মধ্যে একজন আলোচনায় আছেন।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, বেগম সেলিমা রহমান, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাঈল জবিউল্লাহ, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, জিয়া হায়দারসহ কয়েকজন।
এদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবীব-উন-নবী খান সোহেলও আলোচনায় আছেন।
প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতাবিষয়ক বড় কোনো দায়িত্বে যাচ্ছেন তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনও এ ধরনের কোনো দায়িত্ব পেতে পারেন বলে আলোচনায় আছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন মন্ত্রসভা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পরই মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষণ গণনা শুরু হবে।
সদস্যদের শপথ পড়ানো হবে। তাঁরা আশা করছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যেই শপথ পড়ানো হবে এবং দেশবাসী নতুন সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি নতুন মন্ত্রিপরিষদ দেখতে পাবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



