বিশেষ প্রতিবেদন : অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর অব্যাহতি, কর মওকুফ এবং নীতিগত সুবিধা দেওয়ার কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এসব সুবিধা দেওয়ায় রাজস্ব খাতে সম্ভাব্য প্রভাব এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
করমুক্তির সিদ্ধান্ত: পাঁচ বছরে হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন
২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি এই সুবিধা পাবে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
আরও পড়ুন
ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংকের সব ধরনের আয় আয়করমুক্ত। অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যাংক তার ব্যাবসায়িক কাজ করে আয় করবে, তবে সরকারকে এখন থেকে কোনো ধরনের আয়কর দেবে না। এভাবে টানা পাঁচ বছর এই সুবিধা পাবে গ্রামীণ ব্যাংক।
সাম্প্রতিক কর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছরে গড়ে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আয়কর পরিশোধ করেছে। সেই হিসাবে পাঁচ বছরে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি এক হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশের কর-জিডিপি অনুপাত নিম্নমুখী এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো কর অব্যাহতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
নীতিগত পরিবর্তন: সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অর্থ অধ্যাদেশের মাধ্যমে কর অব্যাহতির ক্ষেত্রে নতুন বিধান আনা হয়। এতে বলা হয়, ভবিষ্যতে কর অব্যাহতি দিতে হলে জাতীয় সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, এতে কর সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।
শর্ত পূরণ না করেও ভ্যাট সুবিধার অভিযোগ
গ্রামীণ ডিস্ট্রিভিউশন-এর বিরুদ্ধে ভ্যাট অব্যাহতি পাওয়ার শর্ত পূরণ না করার অভিযোগ উঠেছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট হারে স্থানীয় উৎপাদনের শর্ত থাকলেও তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি অনেক ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। এর ফলে কম ভ্যাট হারে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই ব্যবস্থায় কয়েকশ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা নেওয়া হতে পারে, যদিও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।
কর ফাঁকির অভিযোগ: হাজার কোটির বেশি দাবি
গ্রামীণ কল্যাণ-এর বিরুদ্ধে একাধিক করবর্ষে এক হাজার ৪৩ কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ অনুসন্ধান করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এই দাবির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটি আপিল ও ট্রাইব্যুনালে গেলেও রায় তাদের বিপক্ষে যায়। পরবর্তীতে বিষয়টি আদালতে গড়ায় এবং এখনও মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিতর্কিত রায়: ৬৬৬ কোটি টাকা মওকুফ
গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টের একটি মামলায় ৬৬৬ কোটি টাকার কর পরিশোধের নির্দেশনা আগে দেওয়া হলেও পরবর্তীতে আদালতের রায়ে তা প্রত্যাহার করা হয়।
এই রায়ের পর কর প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে কর অব্যাহতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার প্রেক্ষাপটে কর অব্যাহতির বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট সময়সীমা ও স্পষ্ট শর্ত ছাড়া কর অব্যাহতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে।
সার্বিক চিত্রে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে গ্রামীণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর সুবিধা নিয়ে বিতর্ক শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক করনীতি, রাজস্ব সংগ্রহ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সমতা নিশ্চিত করতে কর অব্যাহতি ও নীতিগত সুবিধাগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


