চট্টগ্রামের কসমোপলিটন আবাসিক এলাকার সরু সড়কটি কয়েক সেকেন্ডেই পরিণত হয় রক্তাক্ত মৃত্যুফাঁদে।
কেএসআরএমের রডবোঝাই একটি ট্রাক, পেছনে কয়েক ফুট বের হয়ে থাকা খোলা রড, আর সেই রডের আঘাতে নিরাপত্তাকর্মী আবদুল মান্নানের (৬১) বিভৎস মৃত্যু। ঘটনার ভয়াবহতায় স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো নগর।
কিন্তু মৃত্যুর পরই শুরু হয় আরও রহস্যঘেরা অধ্যায়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, আইন অনুযায়ী ময়নাতদন্তের দাবি জানানো হলেও পুলিশ উল্টো লাশ দ্রুত দাফনের জন্য চাপ দেয়।
এমনকি থানায় বসেই ‘ম্যানেজ’ করার ভাষায় ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন উঠেছে—একটি অস্বাভাবিক ও ভয়াবহ মৃত্যুর ঘটনায় কেন এত তড়িঘড়ি? কার স্বার্থেই বা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তরের চেষ্টা?
রডের আঘাতে ছিন্নভিন্ন দেহ, রক্তে ভাসে সড়ক:
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেলে নগরের কসমোপলিটন আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কে ঘটে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, কেএসআরএমের রডবোঝাই একটি ট্রাক পেছন থেকে ধাক্কা দেয় নিরাপত্তাকর্মী আবদুল মান্নানকে। ট্রাকের পেছনে বিপজ্জনকভাবে বের হয়ে থাকা খোলা রড তার পেট ভেদ করে শরীরের এক পাশ দিয়ে বেরিয়ে পাশের দোকান পর্যন্ত ঢুকে যায়।
ঘটনাস্থলে থাকা লোকজন জানান, মুহূর্তেই চারদিকে চিৎকার আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রক্তে ভেসে যায় পুরো এলাকা। অনেকেই ঘটনাটিকে “জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর সড়ক দুর্ঘটনা” বলে বর্ণনা করেছেন।
নিহত আবদুল মান্নান নোয়াখালী সদর উপজেলার বাঁধেরহাট এলাকার মোহাম্মদ খোরশেদের ছেলে। জীবিকার তাগিদে চট্টগ্রামে একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
‘ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ নেব না’—স্বজনদের অনড় অবস্থান:
এদিকে দুর্ঘটনার পর মরদেহ নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় পরিবারের অভিযোগের সূত্রপাত।
নিহতের বোন জামাই মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, সকাল থেকেই তারা পাঁচলাইশ থানার পুলিশকে স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন-ময়নাতদন্ত ছাড়া তারা লাশ নেবেন না।
তার ভাষ্য, “সেকেন্ড অফিসার আমাদের বলেছিলেন ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু সারাদিন শুধু ঘুরিয়েছেন। পরে এসআই আমিনুলের কাছে পাঠানো হলে তিনি বলেন, আজ আর সময় নেই, ময়নাতদন্ত হবে না। এরপর বলেন, ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিয়ে যেতে।”
বেলায়েতের দাবি, তারা বারবার আপত্তি জানালেও পুলিশ বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ‘আরটিএ’ (রোড ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট) উল্লেখ থাকলে ময়নাতদন্ত ছাড়াও লাশ দাফন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, “আমরা তো মামলা করতে চাই। তাহলে ময়নাতদন্ত ছাড়া কীভাবে লাশ নেব? এখন লাশ পচে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় বাধ্য হয়েই নিতে হচ্ছে।”
থানায় বসে ‘ম্যানেজের’ অভিযোগ :
নিহতের ছেলে মোহাম্মদ রাসেলের অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও আলোচিত করে তুলেছে। তিনি বলেন, “সকাল থেকে বলা হচ্ছিল ময়নাতদন্ত হয়ে গেছে বা হচ্ছে। কিন্তু বিকেলে গিয়ে দেখি কিছুই হয়নি।
এর মধ্যে থানার সদস্যরা আমাদের ৮০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের কথা বলেছেন। ১১ হাজার টাকা খরচ বাবদ দিয়েছেন, বাকিটা পরে দেওয়ার কথা বলেছেন।”
পরিবারের অভিযোগ, পুরো বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল যেন দ্রুত দাফন সম্পন্ন হলেই ঘটনাটি ‘সহজভাবে’ মিটে যায়।
এ অভিযোগ সামনে আসার পর নগরজুড়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এটি কি কেবল অব্যবস্থাপনা, নাকি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা?
আইন কী বলছে?
ফৌজদারি আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিছক সড়ক দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি অস্বাভাবিক ও সহিংস মৃত্যু।
আইনজীবীরা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশন অনুযায়ী এ ধরনের ঘটনায় সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক। কারণ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনই ভবিষ্যৎ বিচার প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, “ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, আঘাতের ধরন কিংবা অবহেলার মাত্রা আদালতে শক্তভাবে উপস্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে কেএসআরএম গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মিজানুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান বা যে কোন ডিলার থেকে যে কোন গ্রাহকই রড কিনতে পারেন। পরে রাস্তায় কোন দুর্ঘটনা হলে এর দায়ভার তো প্রতিষ্ঠান বহন করবে না। সুতরাং বৃহস্পতিবারের ঘটনাটিরও দায় কেএসআরএমের নেই। তাই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। পুলিশের মাধ্যমে কোনো চাপ দেওয়া বা সমঝোতার বিষয়েও আমরা কিছুই জানি না।
এদিকে সমঝোতার অভিযোগের বিষয়ে পাঁচলাইশ থানার এসআই আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমে জানিয়েছেন “আমি কখনো বলিনি ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ নিয়ে যেতে। বরং আমিই ময়নাতদন্ত করার কথা বলেছি। তারা নিজেরাই দরখাস্ত দিয়েছেন। আর টাকা-পয়সার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”
তবে সব কিছুর উর্দ্ধে যে কয়েকটি প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলছে না সেগুলো হলো, পরিবার ময়নাতদন্ত চাইলে তা দ্রুত সম্পন্ন হলো না কেন? কেন স্বজনদের ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়া হচ্ছিল? থানায় বসে ক্ষতিপূরণের আলোচনা কেন উঠল?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—একটি বিভৎস মৃত্যুর ঘটনায় শুরু থেকেই এত তড়িঘড়ি কেন?
চট্টগ্রামের আলোচিত এই ঘটনায় এখন শুধু একটি মৃত্যুর বিচার নয়, বরং প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



