চট্টগ্রামে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে জমে উঠতে শুরু করেছে পশুর হাট। নগরের সাগরিকা থেকে মুরাদপুর, কর্ণফুলী থেকে ওয়াজেদিয়া—বিভিন্ন হাটে ট্রাকে ট্রাকে আসছে গরু, ছাগল ও মহিষ।
খামারেও বাড়ছে ক্রেতাদের আনাগোনা। কিন্তু হাটের এই ব্যস্ততার আড়ালে এবার বড় এক বাস্তবতা সামনে এসেছে—চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে কোরবানির পশু উৎপাদন গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে কমে গেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব বলছে, এবার কোরবানিতে চট্টগ্রামে পশুর চাহিদা ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। এর বিপরীতে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টি পশু।
অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ৩৫ হাজার ৫২০টি। শুধু ঘাটতিই নয়, এক বছরের ব্যবধানে কমেছে গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া—সব ধরনের পশুর উৎপাদন।
খামারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গো–খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঋণসংকট ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে পাঁচ শতাধিক খামার বন্ধ হয়ে গেছে।
ফলে স্থানীয় উৎপাদনে বড় ধাক্কা লেগেছে। যদিও প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, বাইরের জেলা থেকে পশু আসায় শেষ পর্যন্ত কোরবানিতে সংকট হবে না।
এক বছরে কমেছে প্রায় ৭৮ হাজার পশু
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কোরবানির পশু ছিল ৮ লাখ ৬০ হাজার ৮৮২টি। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৫১টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্থানীয় উৎপাদন কমেছে ৭৭ হাজার ৭৩১টি।
একইভাবে কমেছে কোরবানির মোট চাহিদাও। গত বছর চাহিদা ছিল ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টি। এবার তা কমে হয়েছে ৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৭১টি। সে হিসাবে চাহিদা কমেছে ৭৭ হাজার ৫৮৮টি।
তবে উৎপাদন কমার হার ও খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে এবার বড় সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গরু থেকে ভেড়া—সব ক্ষেত্রেই নিম্নমুখী হিসাব
এ বছর চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্ট করা গরুর সংখ্যা ৪ লাখ ৯৯ হাজার ২৭৯টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৩।
ছাগল রয়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫১৯টি, যেখানে গত বছর ছিল ২ লাখ ৫১ হাজার ৭৪।
মহিষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৮৩৪টিতে। গত বছর ছিল ৬৪ হাজার ১৬৩।
ভেড়ার সংখ্যাও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এবার রয়েছে ৪১ হাজার ৪২৩টি, গত বছর যা ছিল ৫৫ হাজার ৬৯৭।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে চট্টগ্রামে পশু উৎপাদন বাড়ছিল। ২০১৯ সালে স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছিল ৬ লাখ ১০ হাজার ২১৯টি গবাদিপশু।
২০২০ সালে তা বেড়ে হয় ৬ লাখ ৮৯ হাজার ২২, ২০২১ সালে ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৩৩৪, ২০২২ সালে ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫০১, ২০২৩ সালে ৮ লাখ ৪২ হাজার ১৬৫ এবং ২০২৪ সালে ৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৫৯টি।
কিন্তু এবার সেই ধারায় বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে।
বন্ধ হয়েছে পাঁচ শতাধিক খামার
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার ৫০০টি খামার ছিল। তবে গত এক থেকে দেড় বছরে পাঁচ শতাধিক খামার বন্ধ হয়ে গেছে।
খামারিদের ভাষ্য, পশুপালনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই টিকে থাকতে পারেননি। বিশেষ করে গো–খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন ছোট ও মাঝারি খামারিরা।
খামারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পরিবহন ব্যাহত হওয়া, বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রভাবও পড়েছে এই খাতে।
বাইরের জেলার পশুর ওপর ভরসা
চট্টগ্রামে স্থানীয় উৎপাদনে ঘাটতি থাকলেও প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, কোরবানির বাজারে সংকট হবে না। কারণ ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পশু আসা শুরু হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আলমগীর বলেন, “চট্টগ্রামে এবার স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পশুর তুলনায় ৩৫ হাজার ৫২০টির ঘাটতি আছে। তবে এটি বড় কোনো বিষয় নয়। স্থানীয়ভাবে যে পশু রয়েছে, তা অনেকাংশে চাহিদা পূরণে সক্ষম।”
তিনি বলেন, “তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জসহ উত্তরের বিভিন্ন জেলা থেকে পশু আসবে। ফলে শেষ পর্যন্ত পশু উদ্বৃত্তও থাকতে পারে।”
তিনি আরও জানান, গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে প্রায় ৩০০ খামার বন্ধ হয়েছে। গো–খাদ্যের দাম বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে এসব খামার টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
জমে উঠছে হাট
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবার তিনটি স্থায়ী ও তিনটি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়েছে। স্থায়ী হাটগুলো হলো সাগরিকা, মুরাদপুরের বিবিরহাট ও পোস্তারপাড় পশুর হাট। অস্থায়ী হাটের মধ্যে রয়েছে কর্ণফুলী, মুসলিমাবাদ মাঠ ও ওয়াজেদিয়া হাট।
এসব হাটে ইতিমধ্যে ইজারাদাররা প্রস্তুতি শুরু করেছেন। মাঠ সাজানো, নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থার কাজ চলছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রাকে ট্রাকে পশু আসতে শুরু করেছে। নগরের বিভিন্ন অলিগলি ও খামারেও দেখা যাচ্ছে কোরবানির পশুর অস্থায়ী বাজার।
তবে হাটে সরব উপস্থিতির মধ্যেও এবার সবচেয়ে বড় আলোচনায় উঠে এসেছে একটি প্রশ্ন—খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়লে আগামী বছরগুলোতে স্থানীয় উৎপাদনের এই ঘাটতি আরও বাড়বে কি না।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

