চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি জমি যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে প্রভাবশালী মহলের ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে’।
রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় প্রভাব এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে রেলের মূল্যবান জমিতে একের পর এক গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা।
লাইসেন্সের শর্ত ভেঙে চলছে পাকা ভবন নির্মাণ, অথচ চোখের সামনে এসব কর্মকাণ্ড চললেও কার্যত নীরব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় রেল প্রশাসনের ভূমিকা ও জবাবদিহি নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে অভিযোগ এসেছে, সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম রেলওয়ের বাণিজ্যিক লাইসেন্সের শর্ত অমান্য করে রেলের জমিতে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করছেন। চারপাশ টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে গোপনে চালানো হচ্ছে নির্মাণকাজ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সেখানে বহুতল আবাসিক হোটেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজে আরও কয়েকজন অংশীদারও যুক্ত আছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রেলওয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্সকৃত জমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। অস্থায়ী টিনশেড, কাঠ বা বাঁশের কাঠামো ছাড়া অন্য কিছু নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে সেই নিয়মের কোনো বালাই নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ভবনে ব্যবহার করা হচ্ছে ইট, রড, সিমেন্টসহ পাকা ভবন নির্মাণের সব ধরনের উপকরণ।
স্থানীয়রা জানান, একই জায়গায় আগে থেকেই সাইফুল ইসলামের একটি স্থায়ী বসতবাড়ি রয়েছে, যেখানে তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
তাদের অভিযোগ, রেলের জমি দখল এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রথমে বাণিজ্যিক লাইসেন্স নেন, পরে ধাপে ধাপে সেই জমিতে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোই পরিণত হয় ব্যক্তিগত মালিকানার মতো নিয়ন্ত্রিত এলাকায়। আর এ পুরো প্রক্রিয়ায় রহস্যজনকভাবে নীরব থাকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
বিষয়টি নিয়ে স্টেশন মাস্টার নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি দায় এড়িয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “রেলের জমিতে কে কী করছে, সেটা আমার আওতাধীন নয়।”সূত্র-গণকণ্ঠ
তবে বক্তব্য দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই তিনি অভিযুক্ত সাইফুল ইসলামকে নিজের কক্ষে ডেকে আনেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে সাইফুল ইসলাম রাজনৈতিক পরিচয় সামনে এনে বলেন, “আমাকে আওয়ামী লীগও কিছু করতে পারেনি, এখন তো অন্য হিসাব। আমি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি, আমাকে এসব আইন দেখিয়ে লাভ নেই।”
স্থানীয়দের মতে, এই বক্তব্য শুধু একজন ব্যক্তির ঔদ্ধত্য নয়; বরং এটি প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি দখলের অভিযোগের মুখেও যদি কেউ প্রকাশ্যে আইনকে অগ্রাহ্য করার সাহস দেখাতে পারেন, তাহলে তা প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তোলে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, একই এলাকায় আরও কয়েকজন ব্যক্তি রেলের জমি দখল করে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করছেন।
এভারগ্রীন স্কুলসংলগ্ন এলাকায় জামাল নামের এক ব্যক্তি পাকা ভবন নির্মাণ করছেন। কলেজ রোড গেইট ব্যারিয়ারের পাশে বাচ্চু নামের আরেক ব্যক্তি গড়ে তুলেছেন অবৈধ দোকান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই দোকানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে গোপনে মোটা অঙ্কের লেনদেনও হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রেলের জমি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। ফলে দখলদাররা প্রথমে ছোট আকারে স্থাপনা তৈরি করলেও পরে সেগুলো স্থায়ী রূপ পায়।
একসময় রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবের কারণে উচ্ছেদ অভিযানও আর বাস্তবায়ন করা যায় না। এতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার সম্পদ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে।
রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (পূর্বাঞ্চল) সাংবাদিকদের বলেন, “বাণিজ্যিক লাইসেন্সের নামে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, নির্মাণকাজ যখন প্রকাশ্যে চলছে, তখন ব্যবস্থা নিতে তদন্তের অপেক্ষা কেন? রেলের নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থা কোথায়? আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতদিন কী ভূমিকা পালন করেছেন?
সচেতন মহলের মতে, সীতাকুণ্ডে রেলের জমি দখলের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
অবিলম্বে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ, লাইসেন্স বাতিল এবং দায়সারা ভূমিকার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে রেলের আরও বিপুল সম্পদ বেহাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনি/আরএসপি



