back to top

টাকার জোরে শিল্পপতি ইলিয়াসের জামিনে হাইকোর্ট প্রশাসনে নতুন বিতর্ক!

প্রকাশিত: ১৩ মে, ২০২৬ ১৭:০২

চট্টগ্রামের শিল্পপতি মো. ইলিয়াসকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। নারী নির্যাতনের অভিযোগে করা মামলায় আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল তার বিরুদ্ধে। গত ২৭ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার হিলভিউ এলাকার বাসা থেকে সিএমপির একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে।

চট্টগ্রামের লিবার্টি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন সময়ে নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা ও হেনস্তা করেছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমেও এ নিয়ে আলোচনা ছিল। এক ভুক্তভোগী নারীর দায়ের করা নারী নির্যাতন ও প্রতারণার মামলায় শেষ পর্যন্ত তাকে আদালতের মুখোমুখি হতে হয়।

কিন্তু গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই নাটকীয়ভাবে বদলে যায় পরিস্থিতি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫, চট্টগ্রাম ২৮ এপ্রিল তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।

এরপর ৫ মে হাইকোর্টে করা হয় ক্রিমিনাল আপিল। আর মাত্র এক দিনের ব্যবধানে, ৬ মে হাইকোর্টের অ্যানেক্স-১৪ নম্বর বেঞ্চ থেকে জামিন পেয়ে যান ইলিয়াস।

জামিন পাওয়ার ঘটনাই এখন মূল বিতর্ক নয়। বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে—কীভাবে এত দ্রুত তার আবেদন শুনানির জন্য কার্যতালিকায় এলো। অনুসন্ধানে মিলেছে গুরুতর অনিয়মের তথ্য।

জাতীয় একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইলিয়াসের মামলাটি কার্যতালিকায় তোলা হয়েছে নিয়ম ভেঙে। হাইকোর্টে মামলার কার্যতালিকা তৈরির ক্ষেত্রে আবেদন দাখিলের তারিখ অনুযায়ী আলাদা কলাম থাকে।

যে তারিখে আবেদন জমা পড়ে, সেই তারিখের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী মামলার সিরিয়াল নির্ধারণ করা হয়। আদালতপাড়ায় এটি কঠোরভাবে অনুসৃত নিয়ম বলেই পরিচিত।

কিন্তু ইলিয়াসের মামলায় সেই নিয়ম ভাঙার অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধান বলছে, ৬ মে কার্যতালিকায় ইলিয়াসের মামলাটি ছিল ১৮৯ নম্বর ক্রমিকে। মামলার নম্বর—ক্রিমিনাল আপিল ২২২২/২০২৬।

সেখানে মামলাটি রাখা হয়েছিল ১৯ এপ্রিল দাখিল করা মামলার কলামে। অথচ বাস্তবে ইলিয়াসের জামিন আবেদনই করা হয়েছে ৫ মে। কারণ, ট্রাইব্যুনালে তার আবেদন নামঞ্জুর হয় ২৮ এপ্রিল।

অর্থাৎ, যে মামলা ৫ মে হাইকোর্টে জমা হয়েছে, সেটিকে ১৯ এপ্রিলের কলামে স্থান দেওয়া হয়েছে। আদালতপাড়ার ভাষায় একে বলা হয় ‘কলাম ব্রেক’। আইনজীবীরা বলছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং গুরুতর অনিয়ম।

একই দিনে একই বেঞ্চে আরেকটি নারী নির্যাতনের মামলাতেও একই ধরনের ঘটনা পাওয়া গেছে। কার্যতালিকার ১৮৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা ক্রিমিনাল আপিল ২০৪৯/২০২৬ মামলায় জামিন পান তামীম রহমান নামে এক ব্যক্তি।

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ গত ২০ এপ্রিল তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছিলেন। পরে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। কিন্তু তার মামলাটিও রাখা হয় ১৯ এপ্রিলের কলামে।

পরপর দুটি মামলায় একই ধরনের ‘কলাম ব্রেক’-এর তথ্য সামনে আসায় আদালতপাড়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—কারা এই বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে?

মামলাসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অভিযোগ, হাইকোর্টের একটি সংঘবদ্ধ চক্র, কিছু অসাধু কর্মচারী ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে অর্থের বিনিময়ে মামলার সিরিয়াল এগিয়ে আনা হয়।

দ্রুত শুনানি ও আগাম জামিনের সুযোগ করে দিতেই কার্যতালিকায় এই কারসাজি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিনের।

ইলিয়াসের মামলার বাদী, যাঁর নাম আইনি কারণে প্রকাশ করা হলো না, বলেন, “২৮ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর বিদ্যুৎগতিতে হাইকোর্টে শুনানি হয়ে গেল। আমার প্রতিপক্ষ অনেক টাকার মালিক। টাকা খরচ করেই তিনি এই সুবিধা নিয়েছেন।”সূত্র-বি প্রতিদিন

তবে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ কর্মকর্তা মো. মীর কাশেম কলাম ব্রেকের সত্যতা স্বীকার করলেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, “প্রতিদিন অনেক ম্যানশন স্লিপ জমা হয়। ভুলবশত এমন হয়ে থাকতে পারে। আইনজীবীর ম্যানশন স্লিপ অনুযায়ী মামলাটি কার্যতালিকায় যুক্ত হয়েছে। এখানে কোনো অর্থনৈতিক লেনদেন হয়নি।”

সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নাহিদ হোসেন বলেন, “প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মামলা থাকে। আমি মূলত মামলার আইনগত বিষয় দেখি। কার্যতালিকার বিষয়গুলো খেয়াল করার সুযোগ সব সময় থাকে না।”

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তা গুরুতর অনিয়ম ও বেআইনি কাজ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আইনজীবীদের ভাষ্য, আদালতের কার্যতালিকা বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতার অন্যতম ভিত্তি। সেখানে যদি টাকার প্রভাব, তদবির বা গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে মামলার অবস্থান বদলে যায়, তাহলে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

একই দিনে পাশাপাশি দুটি নারী নির্যাতনের মামলায় ‘কলাম ব্রেক’-এর তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর হাইকোর্ট প্রশাসনে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল প্রশাসনিক ‘ভুল’, নাকি বিচারব্যবস্থার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রভাব ও অর্থের অদৃশ্য খেলায় আরেকটি প্রকাশ্য উদাহরণ?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি