চট্টগ্রামের কালুরঘাট ফেরিঘাটের নতুন ইজারা প্রক্রিয়া ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। উচ্চ আদালতের স্পষ্ট স্থগিতাদেশ ও ‘রুল নিশি’ জারির পরও কীভাবে ইজারা কার্যক্রম চালানো হলো—এ প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশাসনিক অন্দরমহল থেকে ব্যবসায়ী মহল পর্যন্ত।
অভিযোগ উঠেছে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে আদালতের নির্দেশনাকে কার্যত অগ্রাহ্য করে গোপনে ইজারা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
গত ৩০ এপ্রিল স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত কালুরঘাট ফেরিঘাটের ইজারা সংক্রান্ত টেন্ডার বিজ্ঞপ্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট পিটিশন (Writ Petition No. 5977 of 2026) দায়ের করা হয়।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ১১ মে হাইকোর্ট বিভাগ ওই টেন্ডার কার্যক্রমের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করেন।
একই সঙ্গে কেন বিজ্ঞপ্তিটি অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি ‘রুল নিশি’ জারি করা হয়।
আদালতের আদেশের প্রত্যয়িত অনুলিপি ইতোমধ্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেছে বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিষয়টি স্বীকারও করেছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী।
তবে আদালতের এই স্থগিতাদেশের পরও কালুরঘাট ফেরিঘাটে ইজারা কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক গোপনীয়তার মধ্যে ২১ মে বৃহস্পতিবার সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়।
খবর পেয়ে বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ঘটনাস্থলে পৌছে সরাসরি সম্প্রচারের চেষ্টা করলে এতে বাধা দেন সওজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
এক পর্যায়ে গণমাধ্যমকর্মীরা ইজারা বক্স দেখতে চাইলে তাদের বাধা দেওয়া হয়। এতে প্রশ্ন উঠেছে—যদি সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়ে থাকে, তাহলে এত গোপনীয়তার প্রয়োজন হলো কেন?
আরও অভিযোগ রয়েছে, যিনি ইজারা প্রক্রিয়ার দায়িত্বে ছিলেন, তিনি সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থান ত্যাগ করেন। ঘটনাটি স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন—কিসের ভয়? কেন এই পলায়ন?
এ বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ওইসময় তিনি কোন গণমাধ্যমের ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে তিনি বলেন, “টেন্ডার কার্যক্রমে সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। বিষয়টি আইনি মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। মতামত অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চালানো হবে।”
টেন্ডার কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এখনো বন্ধ করা হয়নি, তবে যথেষ্ট সময় আছে। এক কলে ফেরি ইজারা ফাইনাল হয় না। গতবার ছয় কলেও হয়নি, সপ্তম কলে ফাইনাল হয়েছে। এবারও আরও অনেকবার কল দিতে হতে পারে।”
এই বক্তব্যই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় টেন্ডার-সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি প্রক্রিয়াগত অগ্রগতিও আদালতের আদেশের পরিপন্থী হতে পারে।
এদিকে বর্তমান ইজারাদার প্রতিষ্ঠান আমরিন এন্ড ব্রাদার্স দাবি করেছে, কালুরঘাট সেতু চালু হওয়ার পর ফেরির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ছোট ও মাঝারি যানবাহন এখন সরাসরি সেতু ব্যবহার করায় ফেরিঘাটটি দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলছে। এর সঙ্গে জোয়ার-ভাটার কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়া, গ্যাংওয়ে ও পল্টুনের ত্রুটি এবং নদীতে নাব্যতা সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আর্থিক ক্ষতির মুখেও জনস্বার্থে তারা কখনো ফেরি চলাচল বন্ধ করেনি। বোয়ালখালী ও আশপাশের অন্তত ২৫টির বেশি শিল্পকারখানার ভারী যানবাহন ও পণ্য পরিবহন অব্যাহত রাখতে তারা নিয়মিত সেবা দিয়ে গেছে। একই সঙ্গে সরকারের সব আর্থিক দায়বদ্ধতাও সময়মতো পরিশোধ করা হয়েছে।
বর্তমান ইজারাদার কর্তৃপক্ষ আদালতের নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদনও জমা দিয়েছে। সেখানে পরিবর্তিত বাস্তবতা ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনগত সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে আমরিন এন্ড ব্রাদার্স। বিজ্ঞপ্তিতে আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে নতুন টেন্ডারে কাউকে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পুরো ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—উচ্চ আদালত যেখানে স্পষ্টভাবে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন, সেখানে কীভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইজারা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সাহস পেলেন?
আদালতের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগ কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যাখ্যায় চাপা পড়বে, নাকি এর পেছনের দায় ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে?
প্রশাসনের একটি অংশ বলছে, বিষয়টি এখন আদালতের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আদালত অবমাননার প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।
অন্যদিকে সচেতন মহলের প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় যদি আদালতের নির্দেশনাই উপেক্ষিত হয়, তবে সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



