টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো হালকা লালচে রঙের নিষিদ্ধ বড়ি। সংখ্যায় ৫ হাজার ৮০০ পিস।
কর্ণফুলী থানা পুলিশের দাবি, মইজ্যারটেক চেকপোস্টে স্বামী-স্ত্রীকে আটকে এই পরিমাণ ইয়াবাই জব্দ করা হয়েছে।
আপাতদৃষ্টে এটি মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরেকটি ‘সফল’ এবং নিয়মিত অভিযান।
কিন্তু এই সাজানো সংখ্যার পেছনেই লুকিয়ে আছে এক হাড়হিম করা অন্ধকার অধ্যায়।
ভেতরের খবর হলো-সেদিন মইজ্যারটেকে উদ্ধার হয়েছিল আসলে ১২ হাজার পিস ইয়াবা।
খোদ নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর দাবি, বাকি ৬ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা মামলার নথিতে আসেইনি। ছায়ার মতো তা মিলিয়ে গেছে মাঝপথেই।
মাদকের করাল গ্রাস থেকে সমাজকে রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই রক্ষকই যখন নিজেই ‘ভক্ষক’ সেজে মাদকের বিশাল একটি চালান গায়েব করে দেন, তখন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়।
এই চাঞ্চল্যকর ও ভয়ংকর জালিয়াতির ঘটনায় অভিযোগের তীর এখন সরাসরি অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া কর্ণফুলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইমরান ফয়সালের দিকে।
মাঝরাতে মইজ্যারটেকে কী ঘটেছিল?
গত কয়েকদিন ধরে কর্ণফুলী এলাকায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে মইজ্যারটেক চেকপোস্টের সেই রাতের রোমহর্ষক গল্প।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে একটি মাদকবাহী চক্রকে ধরতে ওঁৎ পেতে ছিল পুলিশ। ফাঁদে পা দেন এক দম্পতি। তল্লাশি চালিয়ে তাদের কাছ থেকে বের করা হয় বড় একটি ইয়াবার চালান।
সাক্ষী ও বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, গণনার সময় ইয়াবার সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়েছিল। আসামিরাও ভেবেছিল, এত বড় চালানের পর তাদের কপালে দীর্ঘ কারাবাস নিশ্চিত।
কিন্তু আসল খেলা শুরু হয় থানা হাজতে পৌঁছানোর পর। মামলার এজাহার যখন তৈরি হয়, তখন দেখা যায় চোখের পলকে গায়েব হয়ে গেছে অর্ধেকেরও বেশি-ঠিক ৬ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা!
বাকি ইয়াবাগুলো কোথায় গেল? কার পকেটে ঢুকল কোটি টাকার এই বিষাক্ত ট্যাবলেট? এই প্রশ্ন এখন কর্ণফুলীর সচেতন মহলের মুখে মুখে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, জব্দ তালিকা থেকে কৌশলে বাদ দেওয়া এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবা হয়তো আবারও কোনো মাদক কারবারির হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ছে যুবসমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মইজ্যারটেক এলাকার এক ব্যবসায়ী প্রতিবেদককে জানান, “আমরা পুলিশের ওপর ভরসা রাখি। কিন্তু অভিযানের নামে যদি উদ্ধার হওয়া মাদকই আবার বাজারে বিক্রির জন্য সরিয়ে ফেলা হয়, তবে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? এর একটা নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া দরকার।”
এই ভয়ংকর অভিযোগের সত্যতা জানতে অভিযুক্ত এসআই ইমরান ফয়সালের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রতিবারই রিং হয়ে কেটে গেছে।
আইনের রক্ষক হয়েও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এই গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি হতে তার এই এড়িয়ে চলার নীতি সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে।
অবশ্য অন্য একটি গণমাধ্যমের কাছে তিনি এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ বানোয়াট দাবি করে বলেছিলেন, “সবকিছু সাক্ষীদের সামনেই গোনা হয়েছে।”
একই সুরে সুর মিলিয়েছেন কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন। তিনি যেন পুরো ঘটনাটিকে একটি সাধারণ প্রক্রিয়ার চাদরে ঢেকে দিতে চাইলেন।
ওসি জানান, মইজ্যারটেকে উদ্ধারকৃত ইয়াবার সংখ্যার ভিত্তিতেই মামলা করা হয়েছে এবং আসামিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
১২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের তথ্যকে এক প্রকার উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, জব্দ তালিকায় যা আছে, তাই সত্য।
মাদক নির্মূলের নামে এই ধরণের লুকোচুরি চট্টগ্রামজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, জব্দ তালিকায় এই ধরণের ভয়াবহ কারচুপি রাষ্ট্র ও জনগণের সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
যদি এসআই ইমরান ফয়সালের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে বুঝতে হবে মাদকের সিন্ডিকেট কতখানি গভীরে শিকড় গেড়েছে।
সাধারণ মানুষ এখন দাবি তুলছেন, মইজ্যারটেক চেকপোস্টের সিসিটিভি ফুটেজ এবং সেদিন অভিযানে অংশ নেওয়া প্রত্যেক পুলিশ সদস্যের কল রেকর্ড খতিয়ে দেখা হোক।
লিলিপুটের মতো ছোট অপরাধীদের ধরে বাহবা নেওয়া পুলিশ প্রশাসন কি পারবে তাদের নিজেদের ঘরের এই বড় মাছটিকে টেনে বের করতে?
নাকি ৬ হাজার ২০০ ইয়াবার এই রহস্যময় অন্তর্ধান ফাইলচাপা পড়ে হারিয়ে যাবে অন্ধকারের অতল গহ্বরে? উত্তর জানতে উন্মুখ পুরো চট্টগ্রাম।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

