মাদকের নীল বিষে তছনছ ঘর: কুপিয়ে মা-বাবাকে হত্যা করলো একমাত্র সন্তান!

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৯:৫৪

মাদকের করাল থাবায় অন্ধকার নেমে এলো চট্টগ্রামের আনোয়ারার এক পরিবারে। পারিবারিক কলহের জেরে একমাত্র ছেলের নির্মম ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন বৃদ্ধ মা ও বাবা

শনিবার (২৫ জুলাই) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব গুজরা এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘চৈতন্য মহাজন বাড়িতে’ এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন এলাকার মৃত রেবতি দাশ গুপ্তার পরিবারের সদস্য স্বপন দাশ গুপ্ত (৬৫) এবং তার সহধর্মিণী কল্পনা দাশ (৫৫)।

এই মর্মান্তিক জোড়া খুনের অভিযোগে তাদের একমাত্র সন্তান রিমন দাশ গুপ্তকে (৪২) ঘটনাস্থল থেকেই আটক করেছে পুলিশ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকালে মা-বাবাকে সঙ্গে নিয়েই বাইরে গিয়েছিলেন রিমন। সকাল পৌনে ১২টার দিকে তারা সবাই একসাথে বাড়িতে ফেরেন।

তবে বাড়ি ফেরার পরই শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ উন্মত্ত হয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন রিমন।

মায়ের কান্নাকাটি ও চিৎকার শুনে তাকে বাঁচাতে ছুটে আসেন বৃদ্ধ বাবা স্বপন দাশ গুপ্ত। কিন্তু মাদকের বিষে অন্ধ ছেলে বাবাকেও রেহাই দেয়নি, তাকে লক্ষ্য করেও এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করতে থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আর্ত চিৎকার শুনে আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখি রক্তভেজা ঘরে দুজন নিথর হয়ে পড়ে আছেন। আমরা বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।

ঘটনাস্থলেই ঢলে পড়েন কল্পনা দাশ। গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় স্বপন দাশ গুপ্তকে উদ্ধার করে দ্রুত আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি; চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

স্থানীয়দের কাছ থেকে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘাতক রিমন দাশ গুপ্ত দীর্ঘ দিন ধরেই মারাত্মক মাদকাসক্ত ছিলেন। সন্তানকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে মা-বাবা চেষ্টা কম করেননি।

বহুবার তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে (রিহ্যাব) ভর্তি করা হলেও মাদক থেকে মুক্ত করা যায়নি তাকে। সেই নেশার আগুনে শেষ পর্যন্ত ভস্মীভূত হলো পুরো পরিবারটি।

ঘটনার পরপরই এলাকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আনোয়ারা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত রিমনকে আটক করে।

আনোয়ারা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, সংবাদ পাওয়া মাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত রিমন দাশ গুপ্তকে আটক করেছে। ঘটনাস্থল থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং হাসপাতালে অন্যজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনার নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবেশীদের নীরব কান্নায় এখন ভারী হয়ে আছে আনোয়ারার পূর্ব গুজরা এলাকা। একটি মাদকাসক্ত জীবনের পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ ও বীভৎস হতে পারে, এই ঘটনা যেন আরও একবার সমাজকে সেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি