ফাইল এগোয় টাকায়
স্বজনপ্রীতি-ভুয়া ভেন্ডর ও কোয়ার্টার বাণিজ্য
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিবহন বিভাগের শিপিং শাখায় এক কর্মচারীর জিম্মিতে পরিণত হয়েছেন সাধারণ শিপিং এজেন্ট ও ব্যবসায়ীরা।
ফাইল আটকে ঘুষ আদায়, স্বজনের নামে লাইসেন্স নিয়ে বাণিজ্য, সরকারি কোয়ার্টার সাবলেট দেওয়া এবং ভুয়া কাগজপত্রে সরকারি মোটরসাইকেলের তেল ও মেরামত বিল তোলার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে একই শাখায় টানা আট বছর ধরে কর্মরত উচ্চমান সহকারী মো. আরিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক ক্ষমতার ভোল বদলে সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখা এই কর্মচারীর কারণে সরকারের রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা।
টাকায় মেলে ফাইল, না দিলে মাসের পর মাস অপেক্ষা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে একই পদে ও একই শাখায় বহাল রয়েছেন আরিফ মাহমুদ। সরকারি নিয়মে এক স্থানে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ না থাকলেও অদৃশ্য ক্ষমতার বলে তিনি বদলি এড়িয়ে চলছেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের শিপিং এজেন্টের কাজ দ্রুত শেষ করা কিংবা বিভিন্ন আবেদন নিষ্পত্তিতে তার টেবিল পার হওয়াই প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অর্থ না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয় দিনের পর দিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিপিং এজেন্টের কর্মকর্তা জানান, ঘুষের টাকা না দিলে সাধারণ নথিও মাসের পর মাস টেবিলে পড়ে থাকে। বাধ্য হয়ে অনেকে তার অন্যায্য দাবি মেনে নেন।
এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে টাকা লেনদেন সংক্রান্ত কথোপকথনের একটি স্পষ্ট অডিও রেকর্ডও সংরক্ষিত রয়েছে, যেখানে ঘুষ দাবির প্রমাণ মেলে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর না দিয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করেন তিনি।
‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ ও স্বজনপ্রীতি সিন্ডিকেট
বিগত সরকার আমলে তৎকালীন চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এমএ লতিফ এবং বন্দর সিবিএ-এর প্রভাবশালী এক নেতার ছত্রছায়ায় আরিফ মাহমুদ তার আপন ভাইয়ের নামে ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ভেন্ডর লাইসেন্স বাগিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওই ভেন্ডরের মাধ্যমে যেসব শিপিং এজেন্ট কাজ করাতেন, তাদের ফাইল নিমেষেই ছাড় পেত। আর যারা এই সিন্ডিকেটে সায় দিতেন না, তাদের পোহাতে হতো হয়রানি।
যদিও আরিফ মাহমুদ এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন, তবে সরকারি নথি পর্যালোচনায় তার ভাইয়ের নামেই লাইসেন্স নিবন্ধনের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ ও রাজস্ব ফাঁকি
শুধু দফতরেই নয়, বন্দরের দেওয়া সরকারি সুবিধারও অপব্যবহার করছেন এই উচ্চমান সহকারী। আগ্রাবাদের ডেবার পাড় এলাকায় তাকে বরাদ্দ দেওয়া জে-১১৬/বি নম্বর সরকারি কোয়ার্টারে তিনি নিজে না থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে ভাড়া (সাবলেট) দিয়েছেন।
নিজে ছোটপুল এলাকায় নিজস্ব ফ্ল্যাটে অবস্থান করলেও সরকারি কোয়ার্টারের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সুবিধা অবৈধভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষতি।
এছাড়া বন্দর থেকে বরাদ্দ পাওয়া মোটরসাইকেল ব্যবহার না করে তা নষ্ট হিসেবে ফেলে রাখলেও কাগজপত্রে নিয়মিত জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ টাকা উত্তোলন করে নিচ্ছেন আরিফ মাহমুদ। যা সরাসরি সরকারি অর্থ আত্মসাতের শামিল।
ক্ষমতার ভোল বদল ও বদলি আতঙ্ক
চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পর আরিফ মাহমুদ নিজেকে বিএনপি সমর্থিত নির্যাতিত কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুরু করেছেন। বর্তমানে নতুন পরিচয়ের দাপট দেখিয়ে সাধারণ কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের নতুন সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি বন্দর কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিনের কর্মীদের বদলি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করলেও রহস্যজনকভাবে নাম এড়িয়ে গেছে আরিফ মাহমুদের।
প্রশাসনের পদক্ষেপের অপেক্ষা
এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। দীর্ঘ আট বছর একই সংবেদনশীল পদে একজন কর্মচারীর বহাল থাকা এবং সরকারি সম্পদ অপব্যবহারের বিষয়গুলো বন্দরের ট্রাফিক বিভাগ ও হিসাব শাখার নথিপত্র নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধে অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


