বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) দপ্তরে সরঞ্জাম কেনাকাটায় ‘রিভার্স প্রকিউরমেন্ট অর্ডার’ (আরপিও) নামক পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে চরম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও শত কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের তীর মূলত দপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক আনোয়ার এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ আওয়ামী আমলের প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের দিকে।
প্রতিযোগিতা এড়িয়ে পছন্দের গুটিকয়েক সংস্থাকে কাজ দেওয়া, জালিয়াতি এবং সিনিয়র কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করার মাধ্যমে শত কোটি টাকার সরকারি অর্থ লোপাটের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও রেল সূত্রে প্রকাশ পেয়েছে। যা নিয়ে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার দাবি করেছেন, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অঙ্কের সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ সংকুচিত করে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে কাজ কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, এ ধরনের ব্যবস্থা সরাসরি কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ এবং কমিশন লেনদেনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কেনাকাটায় ৩-৪ প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র আধিপত্য
পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত ৭০০-এর বেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও আরপিও পদ্ধতিতে মাত্র তিন-চারটি পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে বড় বড় কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে।
এলটিএম (লিমিটেড টেন্ডারিং পদ্ধতি) বা ওটিএম (উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি) এর মতো প্রচলিত প্রকাশ্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট সংস্থাকে কাজ দেওয়ায় বঞ্চিত ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
কাজের অনুমোদন ও প্রকৃত সরবরাহ ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও মালামাল না নিয়ে বা নিম্নমানের মালামাল গ্রহণ করে কোটি কোটি টাকার বিল পাস করানোর অভিযোগ রয়েছে।
যদিও বিতর্ক ওঠার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কাগজে-কলমে আরপিও স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে পূর্বের নিয়মে কেনাকাটার কথা জানিয়েছে, তবুও আড়ালে এই অনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অভিযোগ করছেন ঠিকাদাররা।
রেল ভবনের একাধিক কর্মকর্তার মতে, পাহাড়তলী দপ্তরে যোগ দেওয়ার পরই আনোয়ারের উদ্যোগে আরপিও পদ্ধতির অনুমোদন নেওয়া হয়।
চাকরির ১৮ বছরেরও বেশি সময় চট্টগ্রামে কাটিয়ে একসাথে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে (অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক-পূর্ব, এবং ডিসিওএস-পরিদর্শন) থেকে তিনি দুর্নীতির একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। সূত্র-বিবি
মালামাল পরিদর্শন না করে বা নিম্নমানের মালামাল গ্রহণ করে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
প্রভাব বিস্তার ও প্রশাসনিক পদায়ন
বাংলাদেশ রেলওয়ের সরঞ্জাম বিভাগের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিগত সময়ে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক প্রভাবের জের ধরে তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলসহ সরঞ্জাম বিভাগের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বে নিযুক্ত হন।
তিনি একই সঙ্গে অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পূর্ব), চট্টগ্রাম এবং ডিসিওএস (পরিদর্শন) পদে আসীন ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর ধরে একই প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভিন্ন পদে বহাল থেকে তিনি দাপ্তরিক সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব বজায় রাখেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কর্মস্থল পরিবর্তন ও প্রশাসনিক রদবদল
বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর সাময়িক পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁকে রাজশাহীতে বদলি করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে পাহাড়তলী সিসিএস অফিসে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরপরই তড়িঘড়ি করে প্রশাসনিক রদবদল ঘটানো হয়।
এতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সরিয়ে পুনরায় আনোয়ারুল ইসলামকে চট্টগ্রামের দাপ্তরিক পদে ফিরিয়ে আনা হয়। এ ধরনের আকস্মিক রদবদল ও ওএসডি করার প্রক্রিয়ার নেপথ্যে প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্রয় প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও দুদকের মামলা
আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে কেনাকাটা ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি এজাহার সূত্রে জানা যায়, একটি ক্রয় প্রক্রিয়ায় মাত্র ২০ হাজার টাকার বাজারমূল্যের আইটেম ১২ লাখ টাকায় কেনার চুক্তি দেখানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে বিষয়টি তদন্তের আওতায় এলে ভুয়া ও জাল চুক্তিপত্র তৈরি করে দাম ৩ লাখ টাকা দেখিয়ে দুদকে দাখিল করার প্রমাণ পাওয়া যায়। নথিপত্রে এই অসামঞ্জস্য ও জালিয়াতি ধরা পড়ায় দুদক তাঁকে প্রধান আসামি (১ নম্বর আসামি) করে একটি মামলা দায়ের করে।
অভিযোগের সঙ্গে মিলছে পুরোনো দুদক মামলার তথ্য
পাহাড়তলী সরঞ্জাম দপ্তরের বর্তমান কেনাকাটা নিয়ে অভিযোগের মধ্যেই আনোয়ারুল ইসলামের পুরোনো দুর্নীতি মামলার তথ্যও সামনে এসেছে।
২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রেলওয়ের পাহাড়তলী কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক দুটি মামলা করে। সূত্র-জাগো
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর (বুধবার) দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলা দুটি করেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. আহসানুল কবীর পলাশ।
দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ১০৯ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় অভিযোগ করা মামলায় ১ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়।
ওই মামলাতে আসামি বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক ফরিদ আহমেদ (৫৫), সাবেক অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (বর্তমানে বেজার উপ-সচিব) মুহাম্মদ রাশেদুল আমিন (৪৮), রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী তাপস কুমার দাস (৪৮) এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ট্রেড অ্যান্ড টেকনোলজির স্বত্ত্বাধিকারী এ এস এম ইকবাল মোর্শেদ (৪৬)।
২০২১ সালের ২৩ মার্চ থেকে ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট পর্যন্ত এসব দুর্নীতির ঘটনা ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
এবং মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ১০৯ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় পৃথক অভিযোগ করা হয়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে জালজালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র পরিবর্তন করে, ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক উভয়ে লাভবান হওয়াসহ প্রতারণামূলকভাবে মালামাল সরবরাহ না করে ভুয়া মালামাল সরবরাহ-ক্রয়ের রেকর্ডপত্র সৃষ্টি করে সরকারের ১ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
২০২০ সালের ৮ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ১৪ জুন পর্যন্ত এসব অনিয়মের ঘটনা ঘটে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে ২৬ নং মামলায় ২৪ লাখ ১৮ হাজার ৭২৩ দশমিক ৫০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। মামলায় বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলাম (৪৮), রেলভবন ঢাকার সাবেক পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম (৫০), রেলওয়ে পাহাড়তলী অফিসের সাবেক প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) মো. রুহুল কাদের আজাদ (৬০), জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পি-২) মো. রাহিদ হোসেন (৩৭), সাবেক সহকারী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক-পি-২ (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) মো. আনোয়ার হোসেন (৬১), সাবেক সহকারী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সদর) মো. এমদাদুর রহমান (৬২), সাবেক এডব্লিউএম/ডিএল এতেসাম মো. শফিক (৩৪) এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স দি কসমোপলিটান কর্পোরেশন এর স্বত্ত্বাধিকারী নাবিল আহসান (৪২)-কে আসামি করা হয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার, কাগজপত্র পরিবর্তন এবং ভুয়া সরবরাহ-ক্রয় রেকর্ড তৈরির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।
অর্থাৎ পাহাড়তলী সরঞ্জাম দপ্তরের ক্রয়প্রক্রিয়ায় নথি, দর নির্ধারণ, পণ্য গ্রহণ ও বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে আগেও অভিযোগ ও মামলা হয়েছে-এটি প্রশাসনিকভাবে নজর দেওয়ার মতো বিষয়।
এই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বর্তমান আরপিওর প্রতিটি কার্যাদেশে পণ্য বাস্তবে সরবরাহ হয়েছে কি না, পণ্য গ্রহণকারী কর্মকর্তা কে, পরিদর্শন প্রতিবেদন কী, স্টক রেজিস্টারে এন্ট্রি হয়েছে কি না এবং পরিশোধের আগে হিসাব বিভাগ কী কী নথি যাচাই করেছে-এসবের মিল পরীক্ষা করা দরকার।
পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তরের বর্তমান আরপিও-সংক্রান্ত অভিযোগ এবং পুরোনো দুদক মামলা দুটি বিষয় একসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে-রেলের সরঞ্জাম ক্রয়ব্যবস্থায় নথি, মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহ যাচাই ও বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ আছে কি না।
আরপিও স্থগিতের কথা রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হলেও স্থগিতের পাশাপাশি আগে সম্পন্ন হওয়া ক্রয়প্রক্রিয়াগুলোরও নথিভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কার্যাদেশের তালিকা, অনুমোদন ফাইল, বাজারদর যাচাই, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, সরবরাহ ও গ্রহণের কাগজপত্র এবং বিল পরিশোধের তথ্য স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের বাস্তবতা নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঠিকাদারি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠে এসেছে আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের (স্ত্রীর ভাতিজা তূর্য ও তনয়) মালিকানাধীন সংস্থাকে সিসিএস দপ্তরের শীর্ষ ঠিকাদারি কাজে সুবিধা পাইয়ে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র-ডিপি
এতে করে সাধারণ ঠিকাদারদের সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার সুযোগ ব্যাহত হয় এবং নির্দিষ্ট একটি চক্রের হাতে ক্রয়ের বড় অংশ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) দপ্তরের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে দপ্তরটির অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক আনোয়ারুল ইসলাম অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
আরপিও (রিভার্স প্রকিউরমেন্ট অর্ডার) পদ্ধতি চালু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ‘রিভার্স প্রকিউরমেন্ট অর্ডার’ বা ‘আরপিও’ নামে কোনো পদ্ধতি অতীতেও প্রচলিত ছিল না, বর্তমানেও নেই। যেহেতু এ জাতীয় কোনো পদ্ধতির অস্তিত্বই নেই, তাই এটি চালু বা অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা থাকার প্রশ্নটি সম্পূর্ণ অবান্তর।
কাজ বণ্টনে স্বজনপ্রীতি ও সীমিত প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদানের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আরপিও পদ্ধতির কোনো ভিত্তি না থাকায় এর আওতায় নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। যদি কেউ সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ বা কার্যাদেশপ্রাপ্ত সরবরাহকারীর তথ্য প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে পারেন, তবে তা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দেখা হবে।
তবে দাপ্তরিক নথিপত্রে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। রেলওয়ের ইনভেন্টরি কন্ট্রোল সেল থেকে জারি করা এক সরকারি নথিতে দেখা যায়, ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট ‘আরপিও নং ২৪৭/এ’ জারি করা হয়।
২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি (স্মারক নং ৪৪.০১.১৫০০.৪৬৭.৪১.০০১.২১-০৫) ব্রাস (BRASS-I ও BRASS-II) অনলাইন সফটওয়্যারে ডেটা এন্ট্রি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রকাশিত ওই নথিতে উক্ত আরপিও-র স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তিন পৃষ্ঠার এই দাপ্তরিক আদেশের শেষ পৃষ্ঠায় ‘পরিচালক (ইনভেন্টরি কন্ট্রোল)’ হিসেবে প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলামের নিজের স্বাক্ষর ও সিল রয়েছে।
আনোয়ারুল ইসলাম আরপিও পদ্ধতি চালু বা অস্তিত্বের বিষয়টি ‘সম্পূর্ণ বানোয়াট ও অবান্তর’ বলে দাবি করলেও, তার নিজের স্বাক্ষরিত আদেশের সূত্রে ‘আরপিও নং ২৪৭/এ’-এর অনুচ্ছেদ-২ উল্লেখ থাকা নিয়ে প্রশাসনিক ও ঠিকাদারি মহলে নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। নথি ও বক্তব্যের এই স্পষ্ট বৈপরীত্যের কারণে পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করছেন সাধারণ ঠিকাদাররা।
চাহিদা খণ্ডবিখণ্ড (স্প্লিটিং) করার অভিযোগ সম্পর্কেও তিনি বলেছেন, কেনাকাটার অনুমোদনের সুবিধার্থে বড় চাহিদাপত্রকে পাঁচ লাখ টাকার ছোট ছোট ফাইলে বিভক্ত করার অভিযোগটি শতভাগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
দুদকের এজাহারভুক্ত অভিযোগে ১ নম্বর আসামি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেটা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এর সাথেই যোগাযোগ করা সমীচীন।
সবশেষে নিকটাত্মীয়দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা প্রশাসনিক পদায়নে প্রভাব বিস্তারের যে দাবি উঠেছে, তা ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এ কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) দপ্তরের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল হোসেনের মুঠোফোনে কল করেও সংযোগ না পেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও দীর্ঘসময় ধরে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।
পাহাড়তলী সরঞ্জাম দপ্তরের প্রায় শত কোটি টাকার কেনাকাটায় কারা কার্যাদেশ পেয়েছে, বাজারদরের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের ফারাক কত, এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগী কমিশন লেনদেন হয়েছে কিনা-এসব বিষয় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনার জোর দাবি তুলেছেন রেলওয়ের সাধারণ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট মহল।
একই সাথে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে দুদকের এজাহারভুক্ত ও দুর্নীতির অভিযুক্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে অবিলম্বে চাকরি থেকে স্থায়ী বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার এবং অপরাধে জড়িত ঠিকাদারদের সকল লাইসেন্স বাতিলপূর্বক কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।


