ওয়াসার মেগা প্রজেক্টের ১০ একর জমি বন্ধকে ব্যাংক ঋণ, ব্যাংকের ভূমিকায় প্রশ্ন

স্বার্থের চরম সংঘাত: পুরো পরিবারই ঋণের জালে!

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:০৩

চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ (পয়ঃনিষ্কাশন) প্রকল্পের জন্য ১৯৬২-৬৩ সালে অধিগ্রহণ করা প্রায় ১০ একর সরকারি জমি ভুয়া দলিলে ব্যাংকে বন্ধক রেখে ২২ কোটি ২৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের এই জালিয়াতির মূল কুশীলব ‘মেসার্স আজমির ট্রেডিং’ এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াকেই খোদ চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়েছে!

নিজস্ব জমি জালিয়াতির শিকার হওয়ায় যে ব্যাংক ঋণখেলাপিদের সম্পত্তি নিলামে তুলতে চেয়েছিল, সেই ব্যাংককে একসময় কড়া ভাষায় সতর্ক করেছিল চট্টগ্রাম ওয়াসা।

অথচ সেই জালিয়াতি চক্রের প্রধানকেই সংস্থাকাজে শীর্ষ অভিভাবক হিসেবে বসানোয় চট্টগ্রামজুড়ে চরম তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে-যাঁকে ঠেকানোর জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা আইনি ও দাপ্তরিক লড়াই চালিয়ে আসছিল, তাঁর হাতেই কীভাবে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়া হলো?

ঋণের জালে গোটা পরিবার

ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেডের খাতুনগঞ্জ শাখার নথিপত্র ও নিলাম বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, খাতুনগঞ্জের ১১৭ আমির মার্কেটের (হাসান চেম্বার) ঠিকানায় নিবন্ধিত ‘মেসার্স আজমির ট্রেডিং’-এর নামে বিপুল অঙ্কের এই ঋণ সুবিধা নেওয়া হয়।

জালিয়াতির মাধ্যমে সংগৃহীত এই ঋণের সঙ্গে মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়ার পুরো পরিবার প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

ইদ্রিস মিয়া (পটিয়ার ছনহরা গ্রামের মৃত সিদ্দিক আহমদের ছেলে) নিজে জমির মালিক, বন্ধকদাতা ও মূল জামিনদার। তাঁর স্ত্রী আলীউননেছা খাতুন, ছেলে মোহাম্মদ ইব্রাহীম হাসান এবং সালমা বেগম নামের আরেক নারীও এই ঋণের বন্ধকদাতা ও জামিনদার হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন।

২০২০ সালের ৮ নভেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এই ঋণের বিপরীতে আসল ও সুদসহ ব্যাংকের মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ২৩ লাখ ৬২ হাজার ৬২২ টাকা।

খেলাপি ঋণ ও নিলামের উদ্যোগ

দীর্ঘদিন ঋণ পরিশোধ না করায় অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি জারি করে ইউনিয়ন ব্যাংক, যা ১৫ নভেম্বর দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়।

নিলামের তফসিলে বন্দর থানাধীন মধ্য হালিশহর মৌজার (আরএস দাগ ১১১, ১১২, ১১১/১৩৭, ১১১/১৩৮, ১১১/১২৯ এবং বিএস দাগ ১৯২৪, ১০৭, ১০৫) মোট ৯৫৭ শতক (৯.৫৭ একর) জমি এবং কোতোয়ালী থানাধীন পাথরঘাটা মৌজায় ৬,৩০০ বর্গফুটের ৩ তলা বাণিজ্যিক ভবনসহ ৫ শতক জমি তালিকাভুক্ত করা হয়।

ওয়াসার কড়া প্রতিবাদ ও কড়া সতর্ক বার্তা

নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই চট্টগ্রাম ওয়াসায় তোলপাড় শুরু হয়। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর ওয়াসার তৎকালীন সচিব শারমিন আলম ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপককে একটি কড়া দাপ্তরিক চিঠি দেন।

চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, বিজ্ঞপ্তির ১ নং তফসিলে থাকা মধ্য হালিশহর মৌজার সম্পত্তিটি ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জন্য ১৯৬২-৬৩ সালে অধিগ্রহণ করা সরকারি জমি।

সালমা বেগমসহ একটি স্বার্থান্বেষী মহল জাল দলিল সৃষ্টি করে এই জমি আত্মসাতের অপচেষ্টা করছে। এর আগে ২০০৬ ও ২০১১ সালেও এই জমি নিয়ে জনসাধারণের জন্য সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল ওয়াসা। চিঠির অনুলিপি বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছিল। গেজেট

ব্যাংকের ‘চোখ বন্ধ’ ভূমিকা ও অনিয়মের বিস্তার

সরকারি অধিগ্রহণকৃত প্রায় ১০ একর জমি কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই কীভাবে ইউনিয়ন ব্যাংক বন্ধক নিল এবং ২২ কোটি টাকার বেশি ঋণ ছাড় করল, তা নিয়ে বড় ধরনের আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

একটি ব্যাংকের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো সম্পদের স্বত্ব পরীক্ষা করা। ওয়াসার আগের সতর্কীকরণ থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক কীভাবে ওই সম্পত্তির মালিকানা গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করল, তা কেবল গাফিলতি নয়-বরং ঋণগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গভীর নজিরবিহীন আঁতাতের ইঙ্গিত দেয়।

রক্ষকই যখন ভক্ষক: স্বার্থের চরম সংঘাত

গত ১৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে অভিযুক্ত মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াকে চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া ইদ্রিস মিয়াই ওয়াসার মেগা প্রকল্পের জমি বন্ধক রেখে ২২ কোটি টাকার বেশি ব্যাংক ঋণ নিয়েছিলেন।

যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওয়াসার হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি জালিয়াতির দালিলিক প্রমাণ রয়েছে, তাঁকেই অভিভাবক করায় চরম স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়েছে।

ওয়াসার কর্মকর্তাদের একাংশের শঙ্কা, জালিয়াতি চক্রের মূল সুবিধাভোগী চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসায় চলমান স্যুয়ারেজ প্রকল্প এবং ওয়াসার বিপুল সম্পত্তি এখন চরম হুমকির মুখে পড়বে। সূত্র-ukbd

এসব অভিযোগের সত্যতা জানতে চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়ার মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও না পেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে কিছু প্রশ্ন রেখে বার্তা পাঠানো হয়। তবে এরিপোর্ট প্রকাশের আগে কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য জানা গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

অবিলম্বের করণীয় ও তদন্তের দাবি

চট্টগ্রামের সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও সংস্থাকে জালিয়াতির হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক।

উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন: সরকারি অধিগ্রহণকৃত জমি যাচাই ছাড়া বন্ধক নিয়ে ঋণ ছাড় করার পেছনে ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও গ্রাহকের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন।

চেয়ারম্যানের নিয়োগ স্থগিত ও আইনি পদক্ষেপ: তদন্ত চলাকালীন স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এবং সম্পত্তি সুরক্ষায় চেয়ারম্যান পদের নিয়োগ স্থগিত করা।

ফৌজদারি মামলা ও সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার: জাল দলিল তৈরি করে রাষ্ট্রীয় জমি হস্তান্তরের অপচেষ্টায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং ৯.৫৭ একর জমি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করা।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি