চাদগাঁও থানায় অন্যায়ের রাজত্ব: ওসির মদদে চাঁদাবাজের পক্ষে পুলিশ!

প্রতিবন্ধীকে মারধর ও মিথ্যা মামলায় হয়রানি: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-আইজিপির দপ্তরে নালিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:১৯

একটি থ্রি-হুইলার সিএনজি অটোরিকশার চার চাকা ঘুরলে যে চার-পাঁচ জোড়া পেটের ভাত জোটে, তার গতি থামিয়ে দেওয়ার হুমকি নিত্যদিনের।

জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করা মাহবুব আলম নামের এক প্রতিবন্ধী সিএনজিচালকের কপালে জোটে প্রতিদিনের শারীরিক নির্যাতন, ভয়ভীতি আর পুলিশের আইনি চাবুক।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে চত্বরে সাধারণ মানুষ আশ্রয়ের আশায় ছোটে, সেই চাদগাঁও থানা যেন এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে-এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় শারীরিক প্রতিবন্ধী সিএনজিচালক মাহবুব আলমকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা, তাঁর গাড়ি ও আয়ের পথ রুদ্ধ করা এবং শেষমেশ উল্টো তাঁকেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর এক লোমহর্ষক চিত্র ফুটে উঠেছে অনুসন্ধানে।

প্রাপ্ত লিখিত নথিপত্র ও অনুসন্ধানী তথ্যে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর চাদগাঁও এলাকার ৬নং ওয়ার্ড পূর্ব ষোলশহর খাজা রোডের চৌধুরী স্কুল সংলগ্ন হাবিলদার বাড়ির বাসিন্দা মো. মকবুল আহমদের ৪৬ বছর বয়সী ছেলে মাহাবুবুল আলম পেশায় একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী সিএনজি অটোরিকশাচালক।

শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে হার মানিয়ে তিনি বহদ্দারহাট পুকুর পাড় সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে খাজা রোড রুটে গাড়ি চালিয়ে অশেষ কষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিনযাপন করছেন।

কিন্তু স্থানীয় চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও অপরাধী চক্রের মূলহোতা ওমর ফারুক বাদশার নজর পড়ে এই রুটটির ওপর। অভিযোগ অনুযায়ী, ফারুক ও তার ক্যাডার বাহিনী প্রতিদিন ওই রুটে চলাচলকারী প্রতিটি ট্যাক্সি থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৮০ টাকা করে চাঁদা দাবি করে আসছে।

প্রতিবন্ধী মাহাবুবুল আলম এই অন্যায্য ও বেআইনি চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাঁর ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। গত আগস্ট মাসে বহদ্দারহাট এলাকায় প্রকাশ্যে তাকে বেদড়ক মারধর করে রক্তাক্ত করা হয়।

এই ঘটনায় ন্যায়বিচারের আশায় মাহাবুবুল আলম বাদী হয়ে ওমর ফারুক বাদশাসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে চাঁদগাঁও থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-৩০ (৮) ২৬, ধারা: ১৪৩/৩২৩/৩২৪/৩০৭/৩৭৯/৩৮৫/৫০৬ দণ্ডবিধি)।

অর্থাৎ অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বেআইনি সমাবেশ, মারধর, অস্ত্র দিয়ে আঘাত, হত্যাচেষ্টা, চুরি, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি দেখানোর মতো গুরুতর বিষয়। তবে মামলার পর বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, ভুক্তভোগীর জীবনে নেমে আসে নরক যন্ত্রণা।

অভিযোগ উঠেছে, চাঁদগাঁও থানার ওসি মো. জসিম উদ্দিন (আইডি নং: বিপি-৭৭০৪১৩০৮৩৯) এবং ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) মো. মিজানুর রহমান (আইডি নং: বিপি-৯৫২৩২৪৬৫৬০) আসামিদের গ্রেফতার না করে প্রকাশ্যে তাদের মদদ দিয়ে আসছেন।

থানায় মামলা থাকার পরও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে অভিযুক্ত ওমর ফারুক বাদশা ও তার সহযোগীরা গত ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে ফের মাহাবুবুল আলমের ওপর হামলা চালায়, গাড়ি আটকে রেখে আয়ের পথ বন্ধ করে দেয় এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করে।

অনুসন্ধানকালে অভিযোগপত্র থেকে উঠে আসা তথ্য বলছে, অপরাধীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের সুবিধা গ্রহণ করে পুলিশ তাঁদের ‘সোর্স’ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং উল্টো ভুক্তভোগীকে দমাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে।

শুধু মারধর কিংবা হুমকিই নয়, পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদে গত ২৬ সেপ্টেম্বর মাহাবুবুল আলমের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা উল্টো মামলা (মামলা নং-১৪ (৯) ২৬) সাজানো হয়।

আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ভুক্তভোগী যাতে উচ্চপর্যায়ে পুলিশের এই অনিয়ম ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে না পারেন, সেজন্য চট্টগ্রামের ১৬টি থানায় জিডি ও মামলা দিয়ে তাঁকে স্থায়ীভাবে জেলহাজতে রাখার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

অসহায় ও নিপীড়িত প্রতিবন্ধী চালক মাহাবুবুল আলম পুলিশি এই চরম হয়রানি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে অবশেষে সরাসরি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও চট্টগ্রাম পুলিশ কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগে তিনি পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত, অসৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং তাঁর ওপর চাপানো মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের আকুল আবেদন জানান।

অভিযোগের বিষয়ে চাঁদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জসিম উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।তিনি বলেন, চাঁদাবাজদের সুবিধা দেওয়া বা পক্ষপাতিত্বের যে অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ওসি জসিম উদ্দিনের ভাষ্য, পুলিশ আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কাউকে অন্যায় সুবিধা দেয় না। গাড়ি জব্দ বা মামলা-সংক্রান্ত প্রতিটি পদক্ষেপ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই নেওয়া হয়েছে।

তাঁর বক্তব্য, অভিযোগকারীর পুরো পরিবারই মাদক কারবারে জড়িত। সবশেষে তিনি বলেন, কোনো পক্ষের অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। পুলিশের এই বক্তব্যের পর এখন মূল প্রশ্ন তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট প্রকৃতি চৌধুরী ছোটন বলেন, একজন শারীরিকভাবে অক্ষম ও অসহায় নাগরিক যখন অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চাইতে গিয়ে উল্টো পুলিশের দ্বারা হয়রানির শিকার হন, তখন তা আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত হানে।

দণ্ডবিধির যে সকল ধারায় মামলা হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। প্রথম মামলার আসামিদের গ্রেফতার না করে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে কাল্পনিক মামলা সাজানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

যদি পুলিশ কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অপরাধীদের সুরক্ষা দিয়ে থাকেন, তবে এটি বিভাগীয় অপরাধের পাশাপাশি চরম আইনি অপরাধ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইজিপির দপ্তরের উচিত অনতিবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজে আইন রক্ষাকারী সংস্থার এমন নগ্ন পক্ষপাতিত্ব সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দেয়।

একজন প্রতিবন্ধী শ্রমজীবী মানুষ যিনি নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন, তাঁকে এভাবে ক্ষমতার দাপটে পিষে মারা কেবল একটি ব্যক্তি-অভিযোগ নয়, এটি পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর এক বড় প্রশ্নের সৃষ্টি করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর অবিলম্বে এই নালিশের সুষ্ঠু তদন্ত করে ভুক্তভোগী সিএনজিচালককে নিরাপত্তা প্রদান করবে এবং অন্যায়ের সাথে যুক্তদের আইনের আওতায় আনবে-এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন নগরবাসীর।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি