২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর কি সত্যি ধ্বংস হচ্ছে পৃথিবী?

বিজ্ঞান নাকি জাদুকরী বিভ্রম

জাহিদ হোসাইন খান প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৪৯

আগামী ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর-তারিখটি যতই ঘনিয়ে আসছে, একটি পুরনো ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে নেটদুনিয়া থেকে বিজ্ঞানের আঙিনা, সর্বত্রই নতুন করে শুরু হয়েছে গুঞ্জন। ছড়াতে শুরু করেছে এক ধরনের কৌতূহল ও আতঙ্ক।

জল্পনা-কল্পনার কেন্দ্রে ছয় দশক পুরনো একটি গবেষণাপত্র, যেখানে দাবি করা হয়েছিল-এই নির্দিষ্ট দিনটিতেই ইতি ঘটবে মানবজাতির। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও পরিসংখ্যান কি সত্যিই এই শঙ্কার সমর্থন করে, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনো গল্প?

কী ছিল সেই ষাটের দশকের ভবিষ্যদ্বাণীতে?
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৬০ সালে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স জার্নাল’-এ প্রকাশিত হয় একটি প্রবন্ধ, যার শিরোনাম ছিল-‘ডুমসডে: ফ্রাইডে, ১৩ নভেম্বর, এ.ডি ২০২৬’ (Doomsday: Friday, 13 November, A.D. 2026)।

গবেষণাপত্রটির মূল লেখক ছিলেন অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক ও সাইবারনেটিকস বিশেষজ্ঞ হাইঞ্জ ফন ফোরস্টার এবং তাঁর দুই শিক্ষার্থী-প্যাট্রিসিয়া এম মোরা ও লরেন্স ডব্লিউ আমিট। তারা বিগত দুই হাজার বছরের ডেমোগ্রাফিক বা জনমিতির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে একটি জটিল সমীকরণ দাঁড় করান।

তাঁদের দাবি ছিল, বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তাতে ২১ শতাব্দীর মাঝামাঝি (বিশেষ করে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর) তা অসীম সংখ্যায় পৌঁছাবে।

ফলে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়বে এবং মানুষ নিজের ভারেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সে সময় জিনগত, বাস্তুসংস্থান ও জনমিতির বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে এই তত্ত্বটি ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

বাস্তবতার মুখোমুখি গণিত: আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে?
দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই অদ্ভুত তত্ত্বটিকে সম্প্রতি নাকচ করে দিয়েছেন কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালান ম্যাকইচার্ন। আধুনিক পরিসংখ্যান ও বাস্তব তথ্যের আলোকে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, ১৯৬০ সালের সমীকরণ ধরে নির্ধারিত দিনে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার তথ্যটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

অ্যালান ম্যাকইচার্নের তথ্য অনুযায়ী:
জন্মহারের নাটকীয় পতন: ১৯৬০ সালের তুলনায় বর্তমান বিশ্বে সামগ্রিক জন্মহার কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যর্থতা: ১৯৯৩ সালের পর থেকেই ওই গবেষণার গাণিতিক পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব জনসংখ্যার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। কারণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ফোরস্টারের অনুমানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞান নাকি মঞ্চের জাদুকরী কৌশল?
অধ্যাপক ম্যাকইচার্ন এই গবেষণার নেপথ্যের এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছেন। গবেষণার মূল লেখক হাইঞ্জ ফন ফোরস্টার তাঁর জীবনের একটি পর্যায়ে পেশাদার মঞ্চ জাদুকর হিসেবে কাজ করেছিলেন।

ফলে ধারণা করা হয়, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে নিখাদ বিজ্ঞান, গাণিতিক মডেল এবং আধুনিক সমীকরণের সঙ্গে মঞ্চের বিভ্রম বা ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনাকে এক করে এই রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছিলেন।

অর্থাৎ, এটি একটি বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তা অপেক্ষা বুদ্ধিবৃত্তিক রসিকতা বা প্রচার পাওয়ার একটি কৌশল ছিল বললেই চলে।

ষাট দশকের অন্যরকম ট্রেন্ড
উল্লেখ্য, ষাটের দশকে এই ধরনের অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণীর চল কেবল ফন ফোরস্টারের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই একই সময়ে মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মী ও ইউএফও গবেষক চ্যান থমাসের লেখা ‘দ্য অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ স্টোরি’ বইয়েও দাবি করা হয়েছিল যে, প্রতি সাড়ে ছয় হাজার বছরে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে।

কৌতুহলজনক বিষয় হলো, মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) বহু বছর ধরে এই বইটি গোপন রেখেছিল এবং পরবর্তীতে ২০১৩ সালে তা অবমুক্ত করে।

ইতিহাসের পাতায় এমন বহু ‘ডুমসডে’ বা পৃথিবী ধ্বংসের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে, যা পরবর্তীতে নিছক কল্পনা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর নিয়ে ১৯৬০ সালে করা ভবিষ্যদ্বাণীটিও তার ব্যতিক্রম নয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাস্তব গতিধারা প্রমাণ করে-আগামী ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর কোনো ধ্বংসের দিন নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের এক চতুর ভুল প্রমাণের স্মৃতিচিহ্ন হয়েই থাকবে। (সূত্র: ডেইলি মেইল)