আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান মানেই অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা-এমনটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু সেই অভিযানের ঠিক পরেই যদি উদ্ধারকৃত আলামত গায়েব হয়ে যায়, সরকারি গাড়িতে হামলার মতো গুরুতর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া হয় এবং ঘুষের বিনিময়ে রাতেই পাল্টে যায় মামলার এজাহার, তবে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, আইনের রক্ষক কারা, আর ভক্ষকই বা কে?
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরীর চান্দগাঁও থানাধীন কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় ৯ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (৯ এপিবিএন) এর একটি বিশেষ অভিযানকে কেন্দ্র করে এমনই এক চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক দুর্নীতির চিত্র সামনে এসেছে।
কোটি টাকার মাদক ব্যবসা আর অস্ত্রের জোরে গড়ে ওঠা এক সিন্ডিকেটের ‘কেরামতি’ এবং তাতে পুলিশের একটি অসাধু মহলের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ পুরো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
অভিযানের রাতে যা ঘটেছিল:
ঘটনার সূত্রপাত গত ১০ অক্টোবর। বিশ্বস্ত সূত্র ও তথ্যদাতা মোহাম্মদ নাহিদের সুনির্দিষ্ট সহায়তায় ৯ এপিবিএন এর একটি দল চান্দগাঁও থানাধীন কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার মেহেরাজ খান চৌধুরী ঘাট সংলগ্ন একটি কুখ্যাত মাদক স্পটে অভিযান চালায়।
অভিযানে দুই হাজার পিস ইয়াবা, ২০ কেজি গাঁজা, নগদ দুই লাখ টাকাসহ মাদকসম্রাজ্ঞী মরিয়ম আক্তার ঝর্ণাকে দুটি স্মার্টফোনসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
কিন্তু আসল নাটক শুরু হয় ঠিক এর পরেই। হাতেনাতে ধরা পড়ার পর ঝর্ণা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে বাঁচাতে নগদ ২০ লাখ টাকা এবং অতিরিক্ত ৫০ কেজি গাঁজা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
একই সঙ্গে নিজের বদলে নিজ কর্মচারী মো. কামরুলকে প্রধান আসামি হিসেবে চালান করার অনৈতিক অনুরোধ জানান।
এ সময় অভিযান পরিচালনাকারী দলের উপস্থিতি টের পেয়ে মাদকসম্রাজ্ঞী ঝর্ণার সশস্ত্র অনুসারীরা হিংস্রভাবে চড়াও হয়। তারা এপিবিএন সদস্য ও সরকারি গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং সরকারি গাড়ির পেছনের গ্লাস ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। বর্বরোচিত এই হামলায় তথ্যদাতা নাহিদকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
৩০ লাখ টাকার লেনদেন এবং সাজানো এজাহার
ঘটনাস্থলে হট্টগোল ও সরকারি সম্পত্তিতে হামলার মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হলেও শেষ পর্যন্ত আইনের বরখেলাপ ঘটিয়ে তৈরি হয় এক অভিনব ‘কারসাজি’। অভিযোগ উঠেছে, ৯ এপিবিএন এর এসপি আরেফিন জুয়েল, ওসি দেবাশীষ, এসআই শাহাদাত এবং এএসআই বাবুলের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও যোগসাজশে ৩০ লাখ টাকার বিশাল অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়।
এই ঘুষের বিনিময়ে পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। সূত্র বলছে, ২০ কেজি গাঁজা ও ২ হাজার পিস ইয়াবার বড় চালানকে রাতারাতি কমিয়ে মাত্র ১ কেজি গাঁজা ও ২৭ পিস ইয়াবা দেখিয়ে নথিপত্র তৈরি করা হয়।
শুধু তাই নয়, মূল মাদকসম্রাজ্ঞী মরিয়ম আক্তার ঝর্ণার পরিবর্তে নামমাত্র ধারায় সাজানো এজাহার দাখিল করা হয় বলে তথ্যদাতারা জানিয়েছেন। এছাড়াও পুলিশের সরকারি গাড়িতে হামলার মতো রাষ্ট্রদ্রোহী ও গুরুতর অপরাধের বিষয়টি মামলার এজাহার থেকে সম্পূর্ণ গায়েব করে দেওয়া হয়েছে এমনটাই দাবি তথ্যদাতার।
এ বিষয়ে ৯ এপিবিএন, চট্টগ্রামের অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সামছুল ইসলাম আকন্দ চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনকে বলেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত গণমাধ্যমে জানানো হবে।
তথ্যদাতার ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন ও অপহরণচেষ্টা
দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের এই পচা চিত্র ফাঁস করে দেওয়ায় কাল হয়ে দাঁড়ায় তথ্যদাতা মোহাম্মদ নাহিদের জন্য। তাকে আইনি সুরক্ষা বা নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে, মাদকসম্রাজ্ঞী ঝর্ণার ক্যাশিয়ার ও বাকলিয়া থানার কনস্টেবল নুরুল আফসার এবং সোর্স বেলালের নেতৃত্বে নাহিদকে প্রকাশ্যে অপহরণ করা হয়।
তাকে টেনেহিঁচড়ে পুনরায় ঝর্ণার গোপন মাদক স্পটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার ওপর চলে পৈশাচিক শারীরিক নির্যাতন। একপর্যায়ে তাকে পুকুরে ফেলে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
পরবর্তীতে ৯ এপিবিএন এর এসআই শাহাদাত তাকে মিথ্যা মামলা ও জেলের ভয় দেখিয়ে চরম মানসিক চাপে রাখেন এবং চিরতরে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করেন। বর্তমানে এই তথ্যদাতা ও তার পরিবার চরম জীবননাশক হুমকির মুখে আত্মগোপনে দিন কাটাচ্ছেন।
মাদকের ভয়ংকর বিস্তার ও প্রশাসনের নীরবতা
চট্টগ্রামের মতো একটি বাণিজ্যিক নগরীতে মরিয়ম আক্তার ঝর্ণার মতো মাদকসম্রাজ্ঞীরা যেভাবে যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তার পেছনে প্রশাসনের একটি মহলের এমন অনৈতিক সুরক্ষা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত বাহিনী (এপিবিএন) এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে যখন অপরাধীরা ছাড় পায়, তখন সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার শেষ ভরসাস্থলটুকুও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের বিচারিক তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
ঘুষ গ্রহণ, মামলার তথ্য গোপনীকরণ, সরকারি গাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা ধামাচাপা দেওয়া এবং মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ৯ এপিবিএন এর এসপি আরেফিন জুয়েল, ওসি দেবাশীষ, এসআই শাহাদাত, এএসআই বাবুল এবং মাদকসম্রাজ্ঞী ঝর্ণার ক্যাশিয়ার বাকলিয়া থানার কনস্টেবল নুরুল আফসারের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সচেতন নাগরিক সমাজ।
একই সাথে, মূল মাদকসম্রাজ্ঞী ঝর্ণা ও তার সশস্ত্র সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে ভুক্তভোগী তথ্যদাতা মোহাম্মদ নাহিদ ও তার পরিবারের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


