চট্টগ্রামে গেলো ছয় বছরে গ্যাসলাইন লিকেজজনিত ৮০০ এর বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।
সাম্প্রতিকতম ঘটনা গেলো সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ভোরে নগরের হালিশহর এলাকায় ঘটে, যেখানে একটি ফ্ল্যাটে গ্যাস বিস্ফোরণে ৯ জন দগ্ধ হন এবং বুধবার দুপুর পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
নিহতরা হলেন—নূরজাহান বেগম রানী (৪০), তাঁর ছেলে মো. শাওন (১৬), দেবর সামির আহমেদ (৪০), তাঁর স্ত্রী আশুরা আক্তার পাখি (৩০) ও সাখাওয়াত হোসেন।
পরিবারটির আরও চার সদস্য বর্তমানে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।
ছয় বছরের পরিসংখ্যান ও দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে ১০৭টি, ২০২১ সালে ১২৯টি, ২০২২ সালে ১৬৪টি, ২০২৩ সালে ১৯৯টি, ২০২৪ সালে ৯৫টি এবং ২০২৫ সালেও শতাধিক গ্যাসলাইন লিকেজজনিত অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তবে এর আগে এমন দুর্ঘটনা কম ছিল না; সমস্যা দীর্ঘদিনের।
বৃহৎ দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও সুপারিশ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবায়ন হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে পাথরঘাটায় গ্যাসলাইনের লিকেজে বিস্ফোরণে সাতজন নিহত হওয়ার পর পাঁচ দফা সুপারিশ করা হয়েছিল।
তাতে ছিল—গ্যাসলাইনের নিয়মিত পরীক্ষা, লিকেজ শনাক্তকরণ ও সতর্কতা, এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। অভিযোগ রয়েছে, এসব সুপারিশ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
হালিশহরের বিস্ফোরণের তদন্ত
হালিশহরের ঘটনার পর কেজিডিসিএল ও ফায়ার সার্ভিস পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কবির উদ্দিন আহমদ জানান, তিন সদস্যের কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গ্যাসের রাইজার অক্ষত পাওয়া গেছে। প্রকৃত কারণ তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন ধারণা করছেন, ফ্ল্যাটের ভেতরে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, গ্যাসলাইনের নিয়মিত মনিটরিং ও লিকেজ পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা গ্যাস বিস্ফোরণের জন্য ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন: পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাসলাইন পরিবর্তন না করা, নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব, অননুমোদিত সংযোগ, অপেশাদার মেরামত, সচেতনতার অভাব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি
সরকারের পদক্ষেপ
শিগগিরই স্বাস্থ্য, শিল্প ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী এই দুর্ঘটনাকে ‘মানবসৃষ্ট দুর্যোগ’ উল্লেখ করে বলেন, গ্যাস লিকেজ প্রতিরোধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, লিকেজ দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকবে। সূত্র : সমকাল



