back to top

চট্টগ্রামে ৫০ কোটির ভবন, ঢাকামুখী দৌড়: বিপিসির ভবিষ্যৎ ঠিকানা কোন পথে?

প্রকাশিত: ২২ মে, ২০২৬ ০৬:৫৪

চট্টগ্রাম নগরীর সার্সন রোডসংলগ্ন জয়পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচতলা একটি নতুন ভবন। যেটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজেদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই কার্যালয় গড়ে তুলেছিল। ঈদুল আজহার পর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে।

কিন্তু ঠিক এমন সময়েই সামনে এসেছে নতুন বিতর্ক। বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সরিয়ে নেওয়ার তৎপরতা চলছে।

সংসদের ৭১ বিধি অনুযায়ী কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী একটি জরুরি জনস্বার্থ নোটিশ দেন।

সেখানে তিনি বিপিসির কার্যক্ষমতা বাড়াতে প্রধান কার্যালয় রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের দাবি জানান। একই সঙ্গে ঢাকায় আলাদা ভবন নির্মাণের প্রস্তাবও আসে।

এরপরই বিষয়টি গুরুত্ব পায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে। ১২ মে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিপিসি চেয়ারম্যানের কাছে মতামত জানতে চেয়ে চিঠি পাঠান।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পর বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা ছয়টি বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে মতামত চেয়ে পৃথক চিঠি দেন।

তিনি বলেন, “মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী জরুরিভিত্তিতে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে।”

এদিকে প্রকল্প পরিচালক ও বিপিসির উপমহাব্যবস্থাপক মো. আপেল মামুন জানিয়েছেন, চট্টগ্রামে বিপিসির নিজস্ব ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি ঈদের কয়েক দিন পর উদ্বোধনের কথা রয়েছে।

তবে উদ্বোধনের আগেই কার্যালয় স্থানান্তরের আলোচনায় তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

বিপিসির নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জ্বালানি তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ইস্টার্ন রিফাইনারিসহ ৮টি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবং দেশের জ্বালানি তেল মজুত ও বিতরণের প্রধান স্থাপনাগুলো চট্টগ্রামেই।সূত্র-এ পত্রিকা

এ ছাড়া দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিকেন্দ্রিক ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ শীর্ষক ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা এবং বিপিসির ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার চট্টগ্রাম-ঢাকা তেল পাইপলাইন প্রকল্পের গোড়াও চট্টগ্রাম।

আমদানি করা জ্বালানি তেল খালাসের পয়েন্ট চট্টগ্রাম বন্দর। এসব বিবেচনায় চট্টগ্রামকেই জ্বালানি খাতের “কেন্দ্র” হিসেবে ধরা হয়।

তবে বিপরীত চিত্রও রয়েছে। বিপিসির নথি বলছে, প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকলেও অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা বছরের বেশিরভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন।

কারওয়ান বাজারের লিয়াজোঁ অফিস থেকেই মূল কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম কার্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। কেউ কেউ একে “ভ্রমণভিত্তিক সফর” বলেও মন্তব্য করেছেন।

তথ্য সূত্রে জানা গেছে, গত ২ ফেব্রুয়ারি অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার মো. রেজানুর রহমান বিপিসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।

এরপর দেশে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যেও চেয়ারম্যান ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসেননি। সর্বশেষ তিনি ৬ ও ৭ মে চট্টগ্রামে আসেন।

তাঁর সফরসূচিতে চট্টগ্রামে ভ্রমণের কথা লেখা ছিল। ঠিক একইভাবে বিপিসির সাত পরিচালকের অধিকাংশই ঢাকায় অবস্থান করেন।

বিপিসির মূল কার্যালয় চট্টগ্রাম নগরীর সল্টগোলা রোডের বিএসসি ভবনে অবস্থিত হলেও শীর্ষ কর্মকর্তারা বছরের পর বছর ঢাকার কারওয়ান বাজারের লিয়াজোঁ অফিস থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

এসব কর্মকর্তা বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সরিয়ে নিতে তৎপর বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব বিষয়ে কথা বলতে বিপিসির চেয়ারম্যানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “ভোটের সময় চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী বানানোর প্রতিশ্রুতি শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।”

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তার ভাষায়, “বিপিসির কার্যালয় ঢাকায় নেওয়ার পেছনে আর্থিক স্বার্থের বিষয় থাকতে পারে—এমন সন্দেহও জনমনে রয়েছে।”

একদিকে চট্টগ্রামে ৫০ কোটি টাকার নতুন সদর দপ্তর প্রায় প্রস্তুত, অন্যদিকে ঢাকায় স্থানান্তরের আলোচনা তীব্র হচ্ছে।

জ্বালানি অবকাঠামোর প্রায় পুরোটা চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগ—শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

চট্টগ্রামের জয়পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নতুন ভবন যেন এখন এক নীরব প্রশ্ন তুলে ধরছে—“আমি কি সত্যিই সদর দপ্তর হবো, নাকি উদ্বোধনের আগেই ইতিহাস হয়ে যাবো?”

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি