পিবিআইয়ের অনুসন্ধান: সামনে এলো নির্মম, কলিজা কাঁপানো সত্য!

প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬ ১৩:০৫

দুই বছর ধরে এটি ছিল একটি নিখোঁজ মানুষের রহস্য। একজন বৃদ্ধ বাবুর্চি হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। পরিবার তাঁকে খুঁজেছে, স্বজনেরা অপেক্ষা করেছে, মেয়ে আদালত আর থানার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন।

কিন্তু কেউ জানত না, যাঁকে খোঁজা হচ্ছে, তিনি আসলে অনেক আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আরও ভয়ংকর সত্য হলো—তাঁর মৃত্যুর পেছনে ছিল না কোনো দুর্বৃত্ত চক্র, ছিল না কোনো অচেনা শত্রু।

অভিযোগ উঠেছে, সেই মৃত্যুর নেপথ্যে ছিলেন তাঁরই জন্ম দেওয়া সন্তান।

চট্টগ্রামের আলোচিত মীর মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার তদন্ত শেষে পিবিআই যে তথ্য সামনে এনেছে, তা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা নয়, এটি পারিবারিক সম্পর্কের ভাঙন: সম্পত্তির লোভ এবং মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের এক শীতল দলিল।

পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, মীর মুজিবুর রহমান (৬০) ছিলেন পেশায় একজন সাধারণ বাবুর্চি। জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। চারটি বিয়ে করেছিলেন তিনি।

দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের প্রায় পুরো জমিই বিক্রি করে দেন। শেষ বয়সে এসে তাঁর হাতে অবশিষ্ট ছিল কেবল বসতভিটার সামান্য অংশ।

তদন্তে উঠে এসেছে, এই সামান্য ভিটেমাটিই হয়ে ওঠে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।

পিবিআই সূত্র বলছে, মুজিবুর রহমান যখন শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করার উদ্যোগ নেন, তখন তাঁর বড় ছেলে বেলাল হোসেন বিষয়টি জানতে পারেন।

পেশায় সিএনজিচালক বেলাল প্রথমে জমির ক্রেতা বা দালাল সেজে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিশ্চিত হতে চান, বাবা সত্যিই ভিটেটি বিক্রি করতে যাচ্ছেন কি না।

এরপর শুরু হয় অভিযোগ অনুযায়ী একটি সুপরিকল্পিত ছক।

তদন্তে জানা গেছে, বেলালের এক নারী বন্ধুকে ব্যবহার করে মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়। ফোনালাপে তৈরি করা হয় বিশ্বাসের সম্পর্ক। একসময় সেই নারী দেখা করার প্রস্তাব দেন।

বৃদ্ধ মুজিবুর রহমান হয়তো ভেবেছিলেন, জীবনের একঘেয়েমির মধ্যে নতুন কোনো পরিচয়ের হাতছানি এসেছে। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, সেই ফোনকলই তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। ২০২৪ সালের ৭ জুন তিনি চট্টগ্রামে আসেন।

পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বাকলিয়া এলাকার একটি বাসায় তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন বেলালের ভায়রা আবদুল জলিল।

তদন্তকারীদের দাবি, ওই বাসায় মুজিবুর রহমানকে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পান করানো হয়। কিছু সময়ের মধ্যেই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর শুরু হয় পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ।

অচেতন অবস্থায় তাঁকে প্রথমে একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে সিআরবি এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে অপেক্ষা করছিল একটি হাইয়েস মাইক্রোবাস। অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়িটিতে ছিলেন স্বয়ং বেলাল হোসেন।

পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এরপর মাইক্রোবাসটি হালিশহর আউটার রিংরোডের দিকে যায়। চলন্ত গাড়ির ভেতরেই মুজিবুর রহমানের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ কাজে বেলালকে সহযোগিতা করেন আবদুল জলিল।

যে মানুষটি একদিন সন্তানকে কোলে তুলে মানুষ করেছিলেন, শেষ যাত্রায় তাঁর পাশে ছিলেন সেই সন্তানই—তবে রক্ষক হিসেবে নয়, ঘাতকের আসনে।

হত্যার পর মরদেহটি সড়কের পাশের একটি নির্জন স্থানে ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে জানা গেছে।

পরদিন পুলিশ একটি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার করে। পরনে ছিল লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি। গলায় ছিল একটি গামছা। পরিচয় শনাক্ত করা না যাওয়ায় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

এভাবেই শেষ হয়ে যায় এক বাবার জীবন। কিন্তু শেষ হয়নি রহস্য।

পরিবারের সদস্যরা তখনও বিশ্বাস করছিলেন, মুজিবুর রহমান কোথাও না কোথাও জীবিত আছেন।

বিশেষ করে তাঁর মেয়ে সালমা বেগম বাবার খোঁজে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যান। একপর্যায়ে নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধেই অপহরণের মামলা করেন তিনি।

সেই মামলাই পরবর্তীতে তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

পিবিআই কর্মকর্তারা বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ, মোবাইল ফোনের কলরেকর্ড, সাক্ষ্য এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে ধীরে ধীরে রহস্যের জট খুলতে শুরু করেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের একপর্যায়ে গ্রেপ্তার হন বেলাল হোসেন ও তাঁর ভায়রা আবদুল জলিল।

গতকাল রোববার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বেলাল হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।

তবে মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র—যে নারীকে ব্যবহার করে ফাঁদ পাতা হয়েছিল বলে অভিযোগ—তাঁকে এখনো খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন মেয়ে সালমা বেগম। দুই বছর ধরে বাবার সন্ধান করতে গিয়ে তিনি যে সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন, তা কোনো সন্তানের জন্যই সহজ নয়।

বিচারের প্রত্যাশায় তিনি আদালতের কাছে আকুতি জানিয়ে বলেছেন, এমন শাস্তি নিশ্চিত করা হোক যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সন্তান সম্পত্তির লোভে নিজের বাবার বিরুদ্ধে এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।

চট্টগ্রামের এই ঘটনাটি এখন কেবল একটি হত্যা মামলার নাম নয়। এটি এমন এক করুণ অধ্যায়, যেখানে একজন বাবা শেষ বয়সে হারিয়েছেন তাঁর জীবন, একটি পরিবার হারিয়েছে বিশ্বাসের ভিত্তি, আর সমাজ আবারও দেখেছে—লোভ যখন বিবেককে গ্রাস করে, তখন সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্কও কখনো কখনো ভয়ংকর ট্র্যাজেডিতে পরিণত হতে পারে।

দুই বছর ধরে অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকা সেই রহস্যের পর্দা অবশেষে সরে গেছে। কিন্তু মীর মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর গল্প রেখে গেছে এক গভীর প্রশ্ন—যে বাবা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের জমি বিক্রি করতে পারেন, তাঁর শেষ আশ্রয়টুকুর মূল্য কি সত্যিই একজন সন্তানের কাছে বাবার জীবনের চেয়েও বেশি হয়ে উঠতে পারে?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি