ডুবল ‘এমভি বে হারবার-২’,মৃত্যুর খুব কাছে গিয়েও ফিরে এলেন ১২ নাবিক!

ঘন কুয়াশা, মুখোমুখি সংঘর্ষ, তারপর জাহাজডুবি

প্রকাশিত: ৩০ জুন, ২০২৬ ১৫:০৭

মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাত। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন বিস্তীর্ণ জলরাশি তখন ঘন কুয়াশায় ঢাকা। কয়েক হাত দূরের দৃশ্যও স্পষ্ট নয়।

এমন প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের ২ ও ৩ নম্বর বয়ার মাঝামাঝি এলাকায় ঘটে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

মুখোমুখি সংঘর্ষে নদীগর্ভে তলিয়ে যায় পাথরবোঝাই লাইটার জাহাজ ‘এমভি বে হারবার-২’

সেই মুহূর্তে জাহাজে থাকা ১২ জন নাবিকের সামনে যেন নেমে আসে মৃত্যুর বিভীষিকা। সংঘর্ষের পর জাহাজটির খোল ফেটে দ্রুত পানি ঢুকতে শুরু করে।

মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল পাথরের ভারে জাহাজটি নদীর তলদেশে হারিয়ে যায়। অন্ধকার, তীব্র স্রোত আর ঘন কুয়াশার মধ্যে পানিতে পড়ে যান জাহাজের সব নাবিক

দুর্ঘটনার খবর পেয়েই কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের উদ্ধারকারী দল মেটাল শার্ক ও বিশেষ উদ্ধারকারী বোট নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।

প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও শুরু হয় রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান। উদ্ধারকারীরা সমুদ্র থেকে আটজন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন।

কিন্তু তখনও চারজনের কোনো খোঁজ মিলছিল না। প্রবল স্রোত তাদের দুর্ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত আনোয়ারা উপজেলার পারকি সমুদ্রসৈকত এলাকায় স্থানীয় জেলে ও সৈকতে থাকা মানুষের তৎপরতায় তাদেরও জীবিত উদ্ধার করা হয়।

আতঙ্কে ভরা সেই রাত শেষ হয় স্বস্তির সংবাদ দিয়ে—জাহাজে থাকা ১২ জন নাবিকের প্রত্যেকেই প্রাণে বেঁচে ফেরেন।

জানা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার ‘এমভি বে হারবার-২’ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পাথর নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল।

তবে নদীর মোহনায় বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি লাইটার জাহাজের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে সবকিছু মুহূর্তেই বদলে যায়।

কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (মিডিয়া) সাব্বির হোসেন বলেন, জাহাজটি ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়।

রাতের অন্ধকার, ঘন কুয়াশা ও তীব্র স্রোতের কারণে অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

তবুও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় কোস্টগার্ডের উদ্ধারকারী দল জাহাজে থাকা ১২ জন নাবিককেই অক্ষত ও জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। উদ্ধার হওয়া সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খাবার দেওয়া হয়েছে।

দুর্ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।

বন্দর সচিব মো. নাছির উদ্দিন জানান, দুর্ঘটনাস্থল দ্রুত চিহ্নিত করা হয়েছে, যাতে অন্য কোনো নৌযান ঝুঁকিতে না পড়ে।

তিনি বলেন, ডুবে যাওয়া জাহাজটি মূল নৌ-চ্যানেলের বাইরে অবস্থান করায় বড় জাহাজ চলাচলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বন্দরের কার্যক্রম ও লাইটার জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ওই এলাকায় সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং দুর্ঘটনাস্থল চিহ্নিত করতে লাল বয়া স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তাৎক্ষণিকভাবে সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে জাহাজ উদ্ধারের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে।

কর্ণফুলীর সেই ভয়াল রাত শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির প্রতিকূলতার সামনে মানুষ অসহায় হলেও, সংকটের মুহূর্তে কোস্টগার্ড, স্থানীয় জেলে ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অনেক সময় মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরিয়ে আনতে পারে জীবন।

এবারও সেই মানবিক সহযোগিতার গল্পেই রক্ষা পেল ১২টি প্রাণ

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি