চট্টগ্রামে এক মানবিক সন্ধ্যার কোলাজ: শৈশবের কান্না ও ম্যাশলোর তত্ত্ব

প্রকাশিত: ০৫ জুলাই, ২০২৬ ২০:৫৩

আমরা কি আসলেই আমাদের শিশুদের মন খারাপের খবর রাখি? নাকি ‘বাচ্চা মানুষের আবার কিসের দুশ্চিন্তা’-এই চিরন্তন অবহেলায় আড়াল করে রাখি তাদের শৈশবের কান্না?

ঠিক এই প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে নেমে এসেছিল এক অন্যরকম মানবিক সন্ধ্যা।

যেখানে এক ছাদের নিচে মিলেমিশে একাকার হলো শৈশবের মনস্তত্ত্ব, বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব আর মানুষের মনের গভীর আকুতি।

শনিবার (৪ জুলাই) চট্টগ্রামের নেভি কনভেনশন সেন্টারে বসেছিল এক অনন্য মিলনমেলা। নিমিত্ত ‘Mental Health Ambassador 2026 Chattogram’।

লাইফস্প্রিং কনসালটেন্সি লিমিটেড (LifeSpring Consultancy Ltd.) এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সংবেদনশীল কর্মসূচিতে অংশ নেন সমাজ ও পেশার নানা স্তরের প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ।

উদ্দেশ্য একটাই। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক মানসিক সহায়তার দীক্ষা নিয়ে নিজের পরিবার ও সমাজের জন্য একজন ‘মানসিক স্বাস্থ্য দূত’ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা।

তিন বছরের শিশুর দুশ্চিন্তা ও এক চিলতে ধ্যান

আজকের তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে তিন বছরের একটা ছোট্ট শিশুও যে মানসিক চাপে ভুগতে পারে, তা হয়তো আমাদের যান্ত্রিক সমাজ সহজে মানতে চায় না।

দেশের খ্যাতনামা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মুনমুন জাহান তাঁর আলোচনায় ঠিক এই রূঢ় বাস্তবতার ওপর আলো ফেললেন।

তিনি তিন বছরের শিশুর দুশ্চিন্তা, মননশীলতা (Mindfulness) এবং মানসিক সুস্থতার গভীর গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তাঁর সেশনের সবচেয়ে জাদুকরী মুহূর্তটি আসে একদম শেষে। হলভর্তি পাঁচ শতাধিক মানুষকে নিয়ে তিনি যখন একটি যৌথ মেডিটেশন বা ধ্যান পরিচালনা করেন, তখন পুরো মিলনায়তনে নেমে আসে এক অদ্ভুত, শান্ত পিনপতন নীরবতা।

যেন প্রত্যেকে ক্ষণিকের জন্য হলেও নিজেদের ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে নিজের ভেতরের অবদমিত শৈশবের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন।

ম্যাশলোর তত্ত্ব এবং বাস্তবতার কোলাজ

অনুষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধাপগুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেন ডা. আরাফাত আজিম।

তিনি প্রখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব ‘ম্যাশলোর চাহিদার স্তরবিন্যাস’ (Maslow’s Hierarchy of Needs) এর আলোকে দেখান, কীভাবে একটি শিশুর মৌলিক চাহিদার পাশাপাশি তার মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জায়গাটি নিশ্চিত না করলে তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

শৈশবের না-বলা কান্নাগুলো কীভাবে এই চাহিদার অপূর্ণতা থেকে জন্ম নেয়, তা উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।

অন্যদিকে, অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ ও ভিজ্যুয়াল স্লাইড উপস্থাপনার মাধ্যমে শিশুদের মানসিক সংঘাতের নানাদিক এবং এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতার জরুরি প্রয়োজনীয়তা ফুটিয়ে তোলেন ডা. মৌমিতা পাল (মৌসুমি)।

“শিশুর মন কোনো মাটির খেলনা নয় যে ভেঙে গেলে আবার জুড়ে দেওয়া যাবে। এর যত্ন নিতে হয় একদম প্রথম দিন থেকে।”

এই আয়োজন কেবল কোনো প্রথাগত সেমিনার ছিল না, বরং তা রূপ নিয়েছিল এক সামাজিক মহাসম্মেলনে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন-আল হিদায়া ইন্টারন্যাশনাল স্কুল,বাংলাদেশ নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজ চট্টগ্রাম, নেভী অ্যাংকারেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রোভার্স স্কাউট, আশার আলো, শিশু নিকেতন ও ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ESDO)-এর প্রতিনিধিবৃন্দ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সমাজের মূল চালিকাশক্তি-সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, পুলিশ ও নৌবাহিনীর কর্মকর্তা সহ নানা শ্রেণি-পেশার সংবেদনশীল মানুষ এক ছাদের নিচে এসেছিলেন শিশুর মনের ভাষা বুঝতে।

আয়োজকেরা জানান, এই আয়োজনের মূল সার্থকতা কেবল একটি অনুষ্ঠান সফল করায় নয়, বরং এখানে আসা প্রতিটি মানুষকে একেকজন Mental Health Ambassador বা ‘মানসিক স্বাস্থ্য দূত’ হিসেবে সমাজ ও পরিবারের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।

যেন এখান থেকে ফিরে গিয়ে তাঁরা নিজ নিজ পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে পারেন, ভাঙতে পারেন এই বিষয়ে জমে থাকা সামাজিক জড়তা (Taboo)।

নেভি কনভেনশন সেন্টারের সেই মানবিক সন্ধ্যাটি হয়তো ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু পাঁচ শতাধিক মানুষের মনে শৈশবের কান্না মোছানোর যে প্রতিজ্ঞা আর ম্যাশলোর তত্ত্বের যে বাস্তব পাঠ বুনে দেওয়া হলো, তা আগামী দিনে এক সুস্থ ও সুন্দর মানসিকতাসম্পন্ন প্রজন্ম গঠনে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি