রোববার থেকে শুরু হওয়া অবিরাম আকাশভাঙা বৃষ্টি আর ওপর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল। এই দুইয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে পর্যটন জেলা বান্দরবান।
জেলা শহরসহ আশপাশের নিম্নাঞ্চল এবং নাইক্ষ্যংছড়ি, রোয়াংছড়ি, লামা ও আলীকদম উপজেলার সহস্রাধিক ঘরবাড়ি এখন পানির নিচে।
ঘরের আসবাবপত্র ছেড়ে, আজন্মের চেনা উঠোন ফেলে বান্দরবানের হাজার হাজার মানুষ এখন ঘরের চালে কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রের বারান্দায় বাঁচার লড়াই করছেন।
আরও পড়ুন
বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। জেলার প্রধান তিনটি নদী। সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাকখালীর পানি এখন প্রমত্তা রূপ নিয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সনাতন কুমার মন্ডল এক উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছেন।
তিনি জানান, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মঙ্গলবারের চেয়ে বুধবার প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত চব্বিশ ঘণ্টায় বান্দরবান জেলায় রেকর্ড ৩০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির কারণেই পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ছে এবং নদীগুলো ধারণক্ষমতা হারিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অব্যাহত বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবান জেলা শহরের শেরেবাংলা নগর, আর্মিপাড়া, মেম্বারপাড়া, ইসলামপুর, উজানীপাড়া এবং মধ্যমপাড়া এলাকার চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সেখানকার সহস্রাধিক ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন জলমগ্ন। জেলার সাতটি উপজেলার হাজার হাজার মানুষ এখন আক্ষরিক অর্থেই পানিবন্দি।
শুধু প্লাবনই নয়, অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে অসংখ্য ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাহাড়ধসের কারণে রুমা-থানচি ও লামা-সূয়ালক সড়কসহ অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সড়কের ওপর ছোট-বড় মাটির স্তূপ ও উপড়ে পড়া গাছ উপদ্রুত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, “পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অবিরাম বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
নদী তীরবর্তী এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে আমরা অবিরাম মাইকিং করছি।”
পাহাড়ের ঢালুতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের প্রাণহানির আশঙ্কায় প্রশাসন, পৌরসভা ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য জরুরি তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলার ৩৪টি ইউনিয়নে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাইক্লোন সেন্টারে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
একই সাথে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক তদারকি করতে একটি জরুরি কন্ট্রোল রুমও চালু করেছে জেলা প্রশাসন।
বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব জানিয়েছেন, সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাকখালী নদীর পানি যেভাবে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, তাতে বৃষ্টি না কমলে বন্যার পানি আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত করতে পারে।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে এখন অসহায় বান্দরবানের মানুষ। এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটে চলা এই মানুষগুলোর চোখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা। কবে থামবে এই বৃষ্টি, আর কবেই বা তারা ফিরে যেতে পারবেন নিজ গৃহে?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

