এভারকেয়ারে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ!

আমরা দুই ভাই ডাক্তার হয়েও ভাইকে বাঁচাতে পারলাম না-আবেগঘন আর্তনাদ

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০৪

সকাল ৯টায় আইসিইউর সিদ্ধান্ত, দুপুর ২টা ৩৫-এ কেবিনে মৃত্যু: দেড় বছরের সন্তান ও গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে চলে গেলেন সুবিমল!

দেড় বছরের এক নিষ্পাপ শিশু বাবার কোল খোঁজে, আর ঘরে থাকা ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী প্রহর গোনেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের।

৩৫ বছরের প্রাণবন্ত তরুণ সুবিমল দাশ সুবীরের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত অবহেলা আর প্রশাসনিক জটিলতার কবলে পড়ে। সুবিমলকে বাঁচাতে প্রাণপণে লড়েছিলেন তার দুই চিকিৎসক ভাই।

কিন্তু চট্টগ্রামের অক্সিজেন-কুয়াইশ রোডের অনন্যা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত বেসরকারী ‘এভারকেয়ার হাসপাতাল’-এর করপোরেট দেয়াল পেরিয়ে সেই চেষ্টা সফল হতে পারেনি।

সুবিমলের অপরাধ ছিল-তিনি ‘থ্যালামিক গ্লাইওমা’ বা মস্তিষ্কের গভীরে হওয়া জটিল ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন। তবে পরিজনদের মতে, সুবিমলের মৃত্যু কেবল ব্যাধির কারণে নয়; এর পেছনে রয়েছে পদে পদে চরম অব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং মানবিকতাহীন করপোরেট অবহেলা।

ছয় ঘণ্টার অপেক্ষা আর ২০০ মিলি ডাবের পানি

ঘটনার সূত্রপাত ২০ জুলাই। রেডিয়েশন থেরাপির জন্য সুবিমলকে নেওয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। দুপুর ২টা ২০ মিনিটে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হলেও ৩টার দিকে তাকে কেবিনে পাঠানো হয়।

স্বজনদের দাবি, সুবিমল দুপুর ১২টার পর থেকে অনাহারে ছিলেন। কেবিনে নেওয়ার পর বারবার আকুতি জানানো সত্ত্বেও প্রশাসনিক কাগজপত্রের জটিলতা দেখিয়ে প্রথম ফিডিং পেতে সময় লাগে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা পর রোগীকে দেওয়া হয় মাত্র ২০০ মিলিলিটার ডাবের পানি।

শুধু খাবার নয়, খিঁচুনি প্রতিরোধক নিয়মিত ওষুধের ক্ষেত্রেও দেখা যায় চরম গাফিলতি। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টায় নির্ধারিত ওষুধ স্বজনদের কাছে থাকা সত্ত্বেও “বাইরের ওষুধ দেওয়া যাবে না” এই দোহাই দিয়ে তা আটকে রাখা হয়।

অভিযোগ, সন্ধ্যা ৬টার ভাইটাল ডোজ না দিয়ে রাত ৯টায় একসংগে দুই ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এরপরই রোগী অতিরিক্ত ঝিমিয়ে পড়েন।

দেশ-বিদেশের আট বিশেষজ্ঞের মত উপেক্ষা!

সুবিমলের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের আটজন জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক একযোগে মত দিয়েছিলেন-টিউমারটি ‘নন-অপারেবল’ বা অস্ত্রোপচারের অযোগ্য।

কিন্তু এভারকেয়ারের নিউরোসার্জন সেই মতামত তোয়াক্কা না করে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন বলে অভিযোগ ডা. আবীর দাশের।

রোগীর ভাইটালস স্বাভাবিক থাকলেও এবং একাধিক এমআরআই ও সিটি স্ক্যানের পর নতুন করে ‘এমআরআই উইথ কনট্রাস্ট’ করার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন চিকিৎসক ভাই।

তার আশঙ্কা সত্য প্রমাণ করে, ২১ জুলাই এমআরআই করার পর রাত থেকেই সুবিমলের দেহে দেখা দেয় অনিয়ন্ত্রিত উচ্চমাত্রার জ্বর, যা পরবর্তীতে তীব্র সংকট তৈরি করে।

২২ জুলাই সকাল ৯টা। চিকিৎসকদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত-রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক, তাকে অবিলম্বে আইসিইউতে স্থানান্তর করতে হবে। বিল সংক্রান্ত কোনো ঝামেলা যেন স্থানান্তরে বাধা না হয়, সে জন্য আগেই হাসপাতালের হিসাবে জমা রাখা হয়েছিল অগ্রিম অর্থ।

অথচ সেই সকাল ৯টা থেকে বিকেল ২টা ৩৫ মিনিট-দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট ধরে রোগীকে ফেলে রাখা হয় সাধারণ কেবিনেই। আইসিইউর দরজার দূরত্ব কি এতটাই বেশি ছিল, যা পার হতে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে?

বিকেল ২টায় ফিডিংয়ের মাত্র ২০ মিনিট পর হঠাৎ দ্রুত নামতে থাকে সুবিমলের অক্সিজেন স্যাচুরেশন। টানা ৩০ মিনিট ধরে স্বজন ও বৃদ্ধা মা আর্তনাদ করে চিকিৎসক-নার্সদের ডাকলেও কেউ কেবিনে আসেননি।

অবশেষে দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে চিকিৎসকেরা যখন পৌঁছালেন, সুবিমলের নিঃশ্বাস তখন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

মৃত সুবিমলের ভাই ডা. আবির দাশ বলেন, আমরা দুই ভাই চিকিৎসক। আমরা যদি এমন অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসায় অবহেলার শিকার হই, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?

নেটদুনিয়ায় চিকিৎসকদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ

ডা. আবীর দাশের আবেগঘন পোস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে একে বেরিয়ে আসছে এভারকেয়ার হাসপাতালের একাধিক তিক্ত ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা।

কমেন্টে এসে ডা. মঈনুল আনাম জানান, ক্যান্সার আক্রান্ত বাবার চিকিৎসায় দেখেছি, সেখানকার ব্যবস্থাপনা খুবই বাজে এবং মানসম্মত কনসালট্যান্টের তীব্র অভাব।

ডা. শম্পা দত্ত বিশ্বাস বলেন, আইসিইউতে ইনটুবেশন করতে গিয়ে মায়ের ফুসফুস ফুটো করে দেওয়া হয়। সামান্য ফোসকার জন্য প্লাস্টিক সার্জারির নামে ব্যবসা চালানো হয়। প্রতিদিন ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বিল আসত, কিন্তু মায়ের প্রাণ বাঁচেনি।

অন্যান্য ভুক্তভোগীরাও জানান, ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকের অবহেলার কারণে স্বজন হারানোর একাধিক অভিযোগ তুলে ধরেছেন বুশরা সিকদার, পুনম চৌধুরীদের মতো সাধারণ ভুক্তভোগীরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন সহানুভূতির জোয়ার, তখন সুবিমলের পরিবার বেছে নিয়েছে নিভৃত শোক।

কোনো আইনি লড়াইয়ে না গিয়ে ডা. আবীর দাশ আফসোস করে বলেন, এটি একটি সম্মিলিত অব্যবস্থাপনার ফসল। করপোরেট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ করার শক্তি বা ইচ্ছে আমাদের আর নেই।

অভিযোগের পাহাড় জমে উঠলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। এভারকেয়ার হাসপাতালের ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক আল মামুনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কেবল জানান, এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরে বক্তব্য জানাবে।

সুবিমল আর ফিরবেন না। তার দেড় বছরের শিশুটি হয়তো কোনোদিন বুঝবে না, চিকিৎসকের পরিবারে জন্মেও কেন সময়মতো অক্সিজেন আর আইসিইউ পেলেন না তার বাবা।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়-একটি অভিজাত বেসরকারি হাসপাতালে জীবন রক্ষাকারী সেবায় এ ধরনের ঢিলেঢালা ভাব কি কেবলই ‘অসংগতি’, নাকি নীরব হত্যাকাণ্ড?

নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি এই দীর্ঘ অবহেলার তালিকা দেখেও নিশ্চুপ থাকবে?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আর এস পি