চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ৩১টি পদে ১৯৫ জন কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নানা অনিয়ম ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির শুনানি সম্পন্ন হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সিডিএ ভবনে অনুষ্ঠিত এই শুনানিতে নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের বিপরীতে সন্তোষজনক দাপ্তরিক ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছেন সিডিএর প্রতিনিধিরা।
এমনকি প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা সরাসরি হাজির না হয়ে কেবল লিখিত বক্তব্য জমা দিয়েছেন, যা তদন্তের স্বাভাবিক গতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
গত ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর প্রকাশিত ৩১টি পদে ১১৫ জন কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকেই সমগ্র নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও আইনি প্রক্রিয়া প্রক্রিয়াধীন রাখা, পরীক্ষার আগের দিন প্রবেশপত্র সরবরাহ, প্রবেশপত্রে তারিখ অনুপস্থিতি, প্রক্সি পরীক্ষার অভিযোগ, নীতিমালা অমান্য করে প্রার্থী বাছাই এবং ঘুষের বিনিময়ে নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।
পরবর্তীতে বিজ্ঞপ্তির অতিরিক্ত পদসহ সর্বমোট ১৯৫ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সার্বিক সত্যতা যাচাইয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এই তদন্ত কমিটি গঠন করে।
শুনানিতে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মিজ্ ফৌজিয়া খান, সদস্য উপসচিব মিজ তাসমিন ফারহানা এবং সদস্যসচিব মিজ আম্বিয়া সুলতানা উপস্থিত থেকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করেন।
সিডিএর পক্ষে বর্তমান চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, সচিব নূর এ জান্নাত রুমী ও সহকারী সচিব মো. আলমগীর খান অংশ নিলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক নথিপত্র প্রদর্শন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
নিয়োগে বাণিজ্যের গন্ধ
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও অন্যতম অভিযোগকারী হাবিবুর রহমান শুনানিতে লিখিত বিবরণ তুলে ধরে জানান, সরকারি নিয়োগের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ১:৫ অনুপাতে মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।
তদুপরি, কোনো প্রকার অপেক্ষমাণ (ওয়েটিং) তালিকা ছাড়াই ৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুনানিকালে তদন্ত কমিটি উল্লিখিত অপেক্ষমাণ তালিকা দেখতে চাইলে সিডিএ কর্তৃপক্ষ তা দেখাতে পারেনি।
অভিযোগ উঠেছে, নিয়মবহির্ভূত সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই পরিকল্পিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতাকে পাশ কাটানো হয়েছে। এছাড়া পদোন্নতির গ্রেডেশন লিস্ট তৈরির আগেই তা বোর্ড সভায় অনুমোদন ও সুপারিশ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এর বাইরে প্রক্সি দেওয়া প্রার্থী ও ত্রুটিপূর্ণ আবেদনপত্র বাতিল না করে নিয়োগ প্রদান, দুজন সহকারী প্রকৌশলীকে বিলম্বে নিয়োগপত্র ইস্যু করা এবং পদোন্নতির গ্রেডেশন লিস্ট চূড়ান্ত হওয়ার আগেই তা বোর্ড সভায় অনুমোদন করানোর মতো গুরুতর প্রশাসনিক বিধিলঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও নিয়োগপ্রার্থী মো. শাখাওয়াত হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, যথাযথ পরীক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও তাকে কৃতকার্য করা হয়নি এবং উত্তরের খাতা পর্যালোচনার আবেদন করা হলেও তা নাকচ করে দেওয়া হয়।
রাজস্ব খাতের অর্থ হরিলুট ও জালিয়াতি
নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বাজেট ও অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত মিলেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৩১টি পদে ১১৫ জনের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও পরবর্তীতে ৯২ জনের নিয়োগপত্র প্রস্তুত করা হয় এবং বর্তমানে ৭৫ জন কর্মী কর্মরত রয়েছেন।
কিন্তু বাজেটে সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব হিসাব থেকে অনৈতিকভাবে ৭৩ লাখ টাকা উত্তোলন করে তাদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা রাজস্ব খাতের স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত সিডিএর ৪৬৫তম বোর্ড সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল-উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তির পর আদালতের রায়ের আলোকে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। কিন্তু সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখা নিয়েও শুনানিতে প্রশ্ন তোলা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কমিটির অগ্রগতি ও শুনানির সর্বশেষ তথ্য জানতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব মিজ্ আম্বিয়া সুলতানাকে মুঠোফোনে না পেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বার্তা পাঠালেও তিনি এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোন মন্তব্য করেননি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
তবে এর আগে অপর এক এক গণমাধ্যমে তদন্তের নিরপেক্ষতার বিষয়ে আশ্বস্ত করে তিনি জানান, আমরা কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলছি না। যুক্তিতর্ক ও দাপ্তরিক প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে।
কোনো ধরনের গাফিলতি ছাড়া সঠিক প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হবে এবং অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যান ও সচিবের লিখিত বক্তব্যও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিয়মকানুন সুরক্ষায় এ ধরনের তদন্তের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষকেরা।
সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে, মন্ত্রণালয় এই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যথাযথ আইনি ও দাপ্তরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে।


