মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের বিশালতার আড়ালে এখন শুধুই শোকের মাতম। ফারম্যাক স্টিল লিমিটেড কারখানায় চুল্লির এক নিমেষের ত্রুটি কা কেড়ে নিল তিনটি তাজা প্রাণ।
ইস্পাত গলানোর উত্তপ্ত ফার্নেস থেকে ছিটকে আসা মারাত্মক ‘হট মেটাল’ বা গলিত লোহায় দগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত হার মানলেন এক চীনা প্রকৌশলীসহ তিন কর্মজীবী মানুষ।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ত ছিল কারখানা প্রাঙ্গণ। কিন্তু আচমকাই ঘটে সেই বিভীষিকা। ফার্নেসের মারাত্মক ত্রুটির কারণে মুহূর্তের মধ্যে চারিদিকে ছিটকে পড়ে ফুটন্ত গলিত লোহা।
আগুনের সেই নারকীয় থাবায় দগ্ধ হন কর্মরত চারজন। জীবন ও মৃত্যুর এই লড়াইয়ে একে একে প্রদীপ নিভে যায় তিনজনের।
মৃত্যুর মিছিলে প্রথম যুক্ত হন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের তরুণ শ্রমিক শরিফুল ইসলাম (২৭)। ১ অক্টোবর সকালে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। রেখে গেছেন দুটি অবুঝ সন্তান আর বুকফাটা কান্নার পরিবার।
একই দিন রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবনের ইতি টানেন অপর শ্রমিক মনির হোসেন (২৭)।
লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছিলেন কারখানার চীনা প্রকৌশলী জেংলিং হং (৫৩)। কিন্তু ২ অক্টোবর সকালে ঢাকার বার্ন ইনস্টিটিউটে তিনিও ঢলে পড়েন চিরনিদ্রায়।
বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন আহত জুয়েল (৩৬)। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ভাগ্যক্রমে তাঁর অবস্থা এখন আশঙ্কামুক্ত।
আইনের বেড়াজাল ও ক্ষতিপূরণের আকুতি:
ঘটনার পর থেকেই শোকে পাথর নিহতদের স্বজনরা। শনিবার সন্ধ্যায় জোরারগঞ্জ থানায় কারখানার চীনা ও বাংলাদেশি কর্মকর্তা এবং স্বজনদের মধ্যে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
নিহত শরিফুলের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রাথমিক আশ্বাস দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
শরিফুলের চাচা মনির হোসেনের গলায় বিচার পাওয়ার চেয়েও বেঁচে থাকার আকুতি ভারী, আমরা কোনো মামলায় যেতে চাই না। আমরা শুধু এই এতিম পরিবারগুলোর জন্য উপযুক্ত ও সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ চাই।
তবে আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ে জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হালিম জানান, স্বজনেরা মামলা না করলেও আইনগতভাবে পুলিশের পক্ষে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কর্তৃপক্ষের দাবি:
দুর্ঘটনা নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এটি কোনো বয়লার বিস্ফোরণ ছিল না। বরং ফার্নেসের আকস্মিক ত্রুটির কারণেই চুল্লি থেকে গলিত লোহা ছিটকে পড়ে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার আসল কারণ অনুসন্ধান ও দায় নির্ধারণে অভ্যন্তরীণ ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
লোহার কারখানার যান্ত্রিক ত্রুটি হয়তো একদিন মেরামত হয়ে যাবে, কিন্তু নিভে যাওয়া তিন জীবন আর মাটিরাঙ্গার সেই দুই অবুঝ শিশুর ভবিষ্যৎ কীভাবে মেরামত হবে-সেই প্রশ্নই এখন বাতাস ভারি করছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


