রাজনীতির মঞ্চে তিনি ছিলেন এক বিশাল ব্যক্তিত্ব। শিল্পোদ্যোক্তা, জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ সারির নেতা এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠ-আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।
মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের আইসিইউতে ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর যখন তার জীবনের চ্যাপ্টারটি শেষ হয়, তখন সবাই জানতেন তার একমাত্র সংসারের কথা।
যে সংসারে ছিলেন নূর নাহার জামান, তিন ছেলে ও তিন মেয়ে-যাদের বড় সন্তান সাইফুজ্জামান চৌধুরী পরবর্তীতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
কিন্তু মানুষের জীবনের গল্প সবসময় কেবল সামনের মঞ্চের আলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আলো-আঁধারির পেছনে তৈরি হওয়া অনেক অধ্যায় ইতিহাস আর সময়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে।
তেমনই এক অতল নীরবতা ভেঙে সম্প্রতি চট্টগ্রামের রাজপথ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-সবখানেই ভেসে উঠেছে এক জাপানি নাম: মিনাকো কাওয়ারাজাকি।
ঘটনাটি দীর্ঘ ১৪ বছরের পুরানো স্মৃতির ছাই ঝেড়ে নতুন করে সামনে আসে গত ২৩ সেপ্টেম্বর। ঢাকার একটি ব্যাংকের টেবিলে এসে পৌঁছে একটি গোপনীয় চিঠি। এক কোটি টাকার একটি স্থায়ী আমানত (এফডিআর) সংক্রান্ত সেই চিঠির প্রেরক-‘নীনা কাওয়ারাজাকি’।
এই একটি চিঠির সুতো ধরেই রাজনৈতিক অলিন্দ ও অনুসন্ধানী অনুসন্ধানে একের পর এক খুলতে শুরু করে বহু বছর আগে বুনে যাওয়া এক নীরব সম্পর্কের নকশা।
নথির পাতার সত্যতা হাতড়ালে দেখা যায়, গল্পটির গোড়াপত্তন ১৯৯২ সালে। সে বছর হুমায়ুন জহির হত্যা মামলায় জড়িয়ে পড়ার পর দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যের পথ ধরেছিলেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু।
বিদেশের মাটিতে সেই উত্তাল রাজনৈতিক নির্বাসনের দিনগুলোতেই ২১ আগস্ট মিনাকো কাওয়ারাজাকির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর লন্ডনের কোনো এক হাসপাতালে জন্ম নেয় তাদের প্রথম কন্যাসন্তান নীনা।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ ঢাকার জাপান দূতাবাস থেকে ইস্যু করা একটি বিয়ের সনদেও সেই সম্পর্কের সিলমোহর মেলে-জাপানি কন্যা মিনাকো কাওয়ারাজাকি ও চৌধুরী আখতারুজ্জামান।
২০০৮ সালের ৮ এপ্রিল হংকংয়ে জাপানের কনস্যুলেট জেনারেল থেকে ইস্যু করা জন্মসনদেও স্পষ্ট লেখা, পিতা-আখতারুজ্জামান চৌধুরী, মাতা-কাওয়ারাজাকি মিনাকো। এই দম্পতির ঘরে পরবর্তীতে আরও এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়।
বিদেশের মাটিতে গড়ে ওঠা এই সম্পর্কের কথা কি আসলেই পুরোপুরি অগোচরে ছিল? সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর বিষয়টি জনসম্মুখে আসে।
আনোয়ারা-কর্ণফুলীর রাজনীতির অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায় অন্য কথা।
স্থানীয় নেতাকর্মী ও পারিবারিক ঘনিষ্ঠদের দাবি-বিষয়টি কোনো ‘গোপন রহস্য’ ছিল না। কর্ণফুলী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নাজিম উদ্দিন হায়দারের মতে, বাবু জীবিত থাকতেই অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তাঁর জাপানি স্ত্রী ও দুই কন্যার প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার বুঝিয়ে দিয়ে পারিবারিক রফা করেছিলেন।
আজ এক যুগেরও বেশি সময় পর এক কোটি টাকার ব্যাংক চিঠিকে কেন্দ্র করে প্রয়াত এই নেতাকে সামাজিকভাবে হেয় করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেই তাঁদের দাবি।
তবে রাজনীতির মাঠে জল তো এক জায়গায় স্থির থাকে না। বিরোধী শিবিরের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন-২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় কেন এই তথ্যটি অনুচ্চারিত থেকে গেল?
দক্ষিণ জেলা বিএনপির এক নেতা অবশ্য সোজাসাপ্টা মন্তব্য করে বিষয়টি ব্যক্তিগত সীমানায় রেখে বলেছেন, কেন তথ্যের উল্লেখ ছিল না তা জানা নেই, তবে এটি মূলত একটি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়।
একটি ব্যাংকের আমানত সংক্রান্ত চিঠি দিয়ে যে গল্পের পুনরাগমন, তার রাজনৈতিক ও সামাজিক রটনা যতই থাকুক না কেন-আইনি বা দাপ্তরিক কাঠামোর দিক থেকে এই মুহূর্তে নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হয়নি।
রাজনীতি, ব্যবসা এবং দূর পরবাসের জীবন-সব মিলিয়ে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর জীবন ছিল এক বিশাল উপন্যাস। জীবনের শেষ বিকেলেও তিনি হয়তো সব হিসেব মিটিয়ে শান্তিতেই বিদায় নিয়েছিলেন।
কিন্তু সময় কখনো কখনো স্মৃতির ডায়েরির পৃষ্ঠা ভুল জায়গায় খুলে দেয়। আর সেই খোলা পাতার নামই এখন ‘মিনাকো’ ও ‘নীনা’-যারা সুদূর টোকিও ও যুক্তরাজ্যের সীমানা পেরিয়ে আবারও এক চর্চিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


