চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ত সড়কের এক কোণে তখন কেবল ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। চারপাশ শান্ত হলেও সতর্ক দৃষ্টি ছিল দায়িত্বরত একদল পুলিশ সদস্যের ওপর। হঠাৎ সন্দেহজনক তিন যুবকের গতিবিধি। থামাতে বলতেই একজন দিল দৌড়!
আর তাকে ধরতেই নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে পিছু নিলেন ২৫ বছর বয়সী তরুণ কনস্টেবল আল আমিন সরদার। কিন্তু তিনি জানতেন না, অপরাধীকে আটকানোর এই সাহসিকতাই তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়াবে।
পেছন থেকে বেপরোয়া গতিতে আসা একটি ঘাতক বাসের ধাক্কায় মুহূর্তেই চুরমার হয়ে যায় তার সব স্বপ্ন। প্রায় ৫০ থেকে ১০০ ফুট রাস্তায় ছেঁচড়ে নিয়ে যায় বাসটি।
চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সোমবার (৫ অক্টোবর) ভোরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই সাহসী পুলিশ সদস্য।
ঘটনাটি ঘটেছিল রোববার (৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে। নগরীর ওয়াসা মোড়ের ইস্পাহানি চেকপোস্টে দায়িত্বরত ছিলেন আল আমিন সহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য।
চেকপোস্টের ইনচার্জ এএসআই হিরণ মিয়া এক সন্দেহভাজন যুবককে ধাওয়া করলে তাকে সহযোগিতা করতে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে সামনে এগিয়ে যান আল আমিন। তাকে থামানোর চেষ্টা করার ঠিক ওই মুহূর্তেই ‘লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ’-এর একটি বাস পেছন থেকে তাকে তীব্র শক্তিতে ধাক্কা দেয়।
ঘটনাস্থলেই মারাত্মক আহত হন আল আমিন। উপস্থিত সহকর্মী ও স্থানীয়রা দ্রুত বাসটিকে আটকে রেখে চালক মোশাররফ (৩৮) ও স্টাফ জয় দাসকে (৩০) পুলিশে সোপর্দ করে। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইনে মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেওয়া আল আমিন সরদার কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ অর্ডার ম্যানেজমেন্ট শাখায় এবং সংযুক্ত ছিলেন কোতোয়ালী থানায়। তার বাড়ি মাদারীপুর জেলায়।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং এক ফুটফুটে সন্তানের জনক। পেশার প্রতি তার যে অগাধ ভালোবাসা ও নিষ্ঠা ছিল, তার প্রমাণ তিনি রেখে গেছেন নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল কবির তিার মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে বলেছেন, সোমবার ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
দায়িত্ব পালনকালে আল আমিনের এই আত্মত্যাগ চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে।
সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, আল আমিনের নিষ্ঠা ও সাহসিকতা সবসময় সিএমপির জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হাবিবুর রহমান প্রামাণিক জানান, আইন অনুযায়ী নিহত আল আমিনের পরিবারকে সব ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা প্রদান করা হবে।
এক খুদে সন্তানের পিতা, কোনো এক পরিবারের আদরের সন্তান আল আমিন হয়তো আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু রাজপথে অপরাধ রুখতে গিয়ে তার এই অসীম আত্মত্যাগ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়ে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


