মোমিন রোডে গান, আবৃত্তি ও দ্রোহের সুর

চট্টগ্রামে উদীচীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৬ ১৯:৩৫

শোষিত-নির্যাতিত মানুষের গণ-আন্দোলনের আলোকবর্তিকা হয়ে প্রায় ছয় দশক ধরে পথ চলা বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়েছে।

এ উপলক্ষে চট্টগ্রাম জেলা সংসদের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা, আবৃত্তি, গণসংগীত ও এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সম্মাননা অনুষ্ঠান।

বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ছয়টায় মোমিন রোডস্থ চট্টগ্রাম একাডেমি প্রাঙ্গণে এই সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।

ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি গোলাপ নিব-দ্ব্যর্থহীন এই স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সভাপতি, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক জসীম চৌধুরী সবুজ।

উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট অসীম বিকাশ দাশের সঞ্চলনায় সভায় বক্তব্য দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট রেজাউল করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আয়াজ মাবুদ এবং উদীচী চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহসভাপতি সুনীল ধর সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাবিবুল আলম বলেন, বিশ্বজুড়ে আজ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও ক্ষমতার দাপটে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরছে। বাংলাদেশও আজ ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের নির্মম শিকার।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তথাকথিত কৌশলগত অংশীদারত্বের নামে রাষ্ট্রঘাতী দাসত্বমূলক চুক্তি আমাদের সার্বভৌমত্বকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।

জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার অপচেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, উদীচী শুরু থেকেই সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন। দেশের সম্পদে জনগণের সর্বভৌম অধিকার নিশ্চিত করতে গণ-প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

এডভোকেট রেজাউল করিম চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী বাংলাদেশকে সুপরিকল্পিতভাবে পদদলিত করার ষড়যন্ত্র চলছে।

মুক্তচিন্তাকে রুদ্ধ করে সমাজে কূপমণ্ডূকতা চাপিয়ে দিতে আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর বারবার আঘাত হানা হচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রবীন্দ্রসংগীত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বাঙালি যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, সেটিই ছিল আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম সাংস্কৃতিক ভিত্তি।

রবীন্দ্রনাথ কেবল সাহিত্য নন, তিনি বাঙালি জাতিসত্তার মৌলিক পরিচয়। উদীচী একাত্তরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রবীন্দ্রবিরোধিতা ও মৌলবাদী অন্ধকারের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

সভাপতির বক্তব্যে জসীম চৌধুরী সবুজ বলেন, ১৯৬৮ সালের এই দিনে সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত ও শহীদুল্লাহ কায়সারের নেতৃত্বে উদীচীর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ গণমানুষের অধিকার আদায়ের ধ্রুবতারা।

মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক দুঃশাসন ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে উদীচীর কর্মীরা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন।

তিনি আরও বলেন, ১৯৯৯ সালে যশোর টাউন হলে এবং ২০০৫ সালে নেত্রকোনায় জঙ্গি হামলায় উদীচীর নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের প্রাণ দিতে হয়েছে।

কিন্তু রক্তের বিনিময়েও উদীচী তার অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী আদর্শ থেকে একচুলও বিচ্যুত হয়নি। ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজন বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে রাজপথের লড়াইকে আরও শাণিত করার শপথ।

আলোচনা সভা শেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। এতে সংগীত পরিবেশন করে ‘বিশ্বতান’, একক আবৃত্তি করেন জয়শ্রী মজুমদার এবং উদ্দীপনামূলক গণসংগীত পরিবেশন করেন উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের শিল্পী-কর্মীরা।

অনুষ্ঠান শেষে সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কৃতি শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি