মামলা বিচারাধীন, ঝুলছে স্থিতাবস্থা-তবুও কেন পুকুরপাড়ে খুঁটি বসাতে মরিয়া বিদ্যুৎ সমিতি?

আইনের স্পষ্ট আদেশ নাকি ক্ষমতার দাপট?

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২১:২৬

আদালতের বিচারাধীন মামলা এবং স্থিতাবস্থা বজায় রাখার স্পষ্ট নির্দেশনাকে পেছনে ফেলে বিরোধপূর্ণ জমিতে খুঁটি স্থাপন ও বিদ্যুৎ লাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর বিরুদ্ধে।

কর্ণফুলী উপজেলার শাহমীরপুর মৌজায় ব্যক্তি মালিকানাধীন ও অংশীদারি একটি পুকুরপাড়ে এমন কার্যক্রমে স্থানীয় মহলে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, কর্ণফুলীর শাহমীরপুর এলাকার বাসিন্দা ফরিদা নাজনীন শামীম গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজারের কাছে এ বিষয়ে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন।

আবেদন সূত্রে জানা যায়, শাহমীরপুর মৌজায় আবেদনকারীর পরিবারের মালিকানাধীন ও অংশীদারি প্রায় ছয় ফুট প্রশস্ত একটি এজমালি পুকুরপাড় রয়েছে।

কোনো সাধারণ বা গণচলাচলের রাস্তা না থাকা এবং আশপাশে মাত্র একটি বসতঘর থাকায় সেখানে নতুন করে বিদ্যুৎ লাইনের জন্য রাস্তা বা খুঁটি স্থাপনের কোনো বাস্তবিক প্রয়োজনও ছিল না।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, ওই নির্দিষ্ট জমি নিয়ে চট্টগ্রাম আদালতে ৮০আইনি লড়াই চলছে (দেওয়ানি মামলা নম্বর: ৮০১/২০২৬)।

চলমান এই মামলার প্রেক্ষিতে গত ১১ জুন আদালত বিরোধপূর্ণ ওই জমিতে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখার আদেশ দেন। পাশাপাশি জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায়ও পৃথক আইনি প্রসেস কার্যকর রয়েছে।

আবেদনকারী ফরিদা নাজনীন শামীমের অভিযোগ, আদালতের চূড়ান্ত রায় বা সিদ্ধান্ত আসার আগেই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সেখানে তড়িঘড়ি করে খুঁটি পোঁতা ও লাইন প্রসারের তোড়জোড় চালাচ্ছে।

এতে করে শুধু জমির বর্তমান ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই পরিবর্তিত হবে না, বরং বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার মূল বিষয়বস্তুও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

তাই আদালতের পরবর্তী আদেশ না আসা পর্যন্ত সেখানে যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত রাখার জোর দাবি জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কর্ণফুলী জোনাল অফিসের উপ মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. সাহাদাত হোসেন জানান, আদালতের কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা অবশ্যই আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হবে।

আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো কাজের ওপর বাধা বা জটিলতা তৈরি হলে আমরা নিয়মানুযায়ী সেখান থেকে সরে আসব।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সদর দপ্তরের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ সরওয়ার জাহান জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এই মুহূর্তে বিস্তারিত অবগত নন।

নথিপত্র যাচাই না করে মন্তব্য করা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮-এর ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ লাইন বা পূর্তকাজের জন্য পথ ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও তা ভূমির মালিককে যুক্তিসংগত সময় আগে লিখিতভাবে জানানো এবং যথাযথ আইনি পথ অনুসরণের ওপর নির্ভরশীল। আইনের ১২ ধারায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিধানও স্পষ্ট।

তবে আইনের গবেষকদের মতে, বিদ্যুৎ আইন যাই বলুক না কেন-আদালতের জারি করা ‘স্থিতাবস্থা’ বা নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ যেকোনো প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ওপরে অবস্থান করে।

আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক যেকোনো উদ্যোগ সরাসরি আদালত অবমাননার সামিল হতে পারে।

এখন বিরোধপূর্ণ পুকুরপাড়ে পল্লী বিদ্যুতের এই উদ্যোগ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কীভাবে সুরাহা হয়, সেদিকেই তাকিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি