back to top

চট্টগ্রামে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু, গ্রামাঞ্চলে বেশি

চলতি বছরেরর ১১ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্ত ৫৬৩

প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৫ ০৬:১৩

ডেঙ্গুর প্রকোপ যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকুনগুনিয়াসহ নানা রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে রোগী।

বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেও অবনতি হচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মশাবাহিত রোগটির আক্রমণ এবার নগরের তুলনাই গ্রামাঞ্চলে বেশি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সভা করে আলোচনায় বসলেও গ্রামের ডোবা-নালা, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করার বিষয়ে যেন মাথ্যা ব্যথাও নেই। ফলে বর্ষার মৌসুমে এসব জায়গায় পানি জমে এডিস মশার অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে।

সিভিল সার্জন অফিসে খবর নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল শুক্রবার (১১ জুলাই) পর্যন্ত চট্টগ্রামে মোট ৫৬৩ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৩১৮ জন পুরুষ, ১৫৬ জন নারী এবং ৮৯ জন শিশু। চলতি বছর মারা গেছে দুজন।

মোট আক্রান্ত ৫৬৩ জনের মধ্যে জেলার ১৫টি উপজেলায় ৩০৯ জন এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকার ২৫৪ জন বাসিন্দা রয়েছেন।

হিসেবে দেখা যায় এবছর এখন পর্যন্ত নগরের তুলনায় উপজেলা পর্যায়ের ৫৫ শতাংশই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশী বাঁশখালীতেই এখন পর্যন্ত ৯৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন।

এরপর ৭১ জন সীতাকুণ্ডে, ২৫ জন আনোয়ারায়, ২৪ জন সাতকানিয়ায়, ২১ জন লোহাগাড়ায়, ১৩ জন রাউজানে, ১০ জন পটিয়ায় আক্রান্ত হন।

এছাড়া আটজন করে মিরসরাই ও হাটহাজারীতে, ৭ জন করে চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া ৬ জন কর্ণফুলী এবং তিনজন সন্দ্বীপ উপজেলায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

এ বছরে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই জুন থেকে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে। জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৭৬ জন। চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১১ দিনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১১৮ জন।

সিভিল সার্জন অফিসে থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে উপজেলা পর্যায়ের ৪৩ এবং নগরের ২৭ জনসহ মোট ৭০ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

পরের মাস ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণ কিছুটা কমে উপজেলা পর্যায়ে ১৫ এবং নগরের ১৩জনসহ মোট ২৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। মার্চে আত্রান্ত হয় ২২ জন। এরমধ্যে উপজেলার ১০ এবং নগরের ১২ জন বাসিন্দা রয়েছেন।

এপ্রিল মাস থেকে বাড়তে থাকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এ মাসে মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৩ জন। যার মধ্যে ১৪ জন উপজেলা পর্যায়ে এবং ১৯ জন নগরের।

এর পরের মে মাসে এই সংখ্যা তিনগুনেরও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। উপজেলার ৬০ জন এবং নগরের ৫৬ জনসহ মোট ১১৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় মে মাসে।

তাছাড়া জুন মাসে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়ে ১৭৬ জনে পৌঁছে, এর মধ্যে ১০৮ জন উপজেলা এবং ৬৮ জন নগরীর বাসিন্দা। চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১১ দিনেই উপজেলা পর্যায়ের ৫৯ এবং নগরের ৫৯জনসহ মোট ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১১৮ জন বলে জানিয়েছে সিভিল সার্জন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকলেও জুন থেকে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে রোগী বেড়ে যায়। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজনন হয়। এবারও বর্ষার শুরু থেকে ডেঙ্গু রোগী ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে।

অথচ সেসব এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা কিংবা জনসচেতনতা কার্যক্রম প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে দিনে দিনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

এদিকে নগরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির খবর নিতে গিয়ে জানা গেছে, ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা নিধনে প্রজননের ওপর পুরোনো জরিপ ধরে সিটি করপোরেশনের তিন থেকে পাঁচ মাসের একটি ‘ক্রাশ’ কর্মসূচি চলমান রেখেছে।

জানা গেছে, ২০২৩-২৪ সালে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), সিটি করপোরেশন ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সমন্বয়ে একটি জরিপ কাজ চলে।

এতে চট্টগ্রামে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পাঁচটি এলাকাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হলো কোতোয়ালি, বাকলিয়া, বায়েজিদ, চকবাজার ও বন্দর এলাকা।

ওই জরিপ ধরেই বর্তমানে মশকনিধন কার্যক্রম চলছে। নতুন কোনো গবেষণা এখন আর হয়নি।

এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম জানান, ২৮ জুন থেকে শুরু হওয়া ক্রাশ কর্মসূচি অনুযায়ী করপোরেশন প্রতিদিন প্রজননপ্রবণ তিনটি স্থানে মশকনিধনে প্রায় ৭০ জন কর্মী সচেষ্ট থাকেন।

এ ছাড়া সাধারণভাবে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় সকালে লার্ভিসাইট ওষুধ ছিটাচ্ছে এবং বিকেলে ফগিং করা হয়। আগের জরিপ অনুযায়ী হটস্পট ধরে ক্রাশ কর্মসূচি করা হচ্ছে। নতুন জরিপ কাজ না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চলবে।

এদিকে বিভিন্ন উপজেলা থেকে অভিযোগ আসছে, গ্রামাঞ্চলে এমনিতেই স্বাস্থ্যসেবা সীমিত। তার মধ্যে মশকনিধন বা ওষুধ ছিটানোর কার্যকর উদ্যোগ চোখেই পড়ছে না।

গ্রামবাসীরা মনে করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনপ্রতিনিধি না থাকায় সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হয়েছে। মশকনিধনের কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়েছে। ফলে দিন দিন উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গুর তীব্রতা বাড়ছে।

এদিকে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ মশকনিধন কার্যক্রমের অভাব এবং জনসচেতনতার ঘাটতি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরাও।

তারা বলছেন, শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা দিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বরং মশকনিধন এবং জনসচেতনতা কার্যক্রমে জোর দিতে হবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবদুর রব বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন, গ্রাম ও উপজেলা এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম চালানো না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু করেছে। এবার নগরের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে বেশি আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সামনের কয়েক মাস এই রোগ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন কার্যক্রম চালানোর কথা বলা হয়েছে।

তাছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরিসহ নানা প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানান তিনি।