back to top

‘ধর্ষককে আমাদের হাতে দিন’-বাকলিয়ায় জনরোষ,গভীর রাত পর্যন্ত উত্তেজনা

প্রকাশিত: ২১ মে, ২০২৬ ১৯:১৮

চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানাধীন চেয়ারম্যান ঘাটা আবু জাফর রোড এলাকায় চার বছরের এক শিশু কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নজিরবিহীন উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও জনরোষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

অভিযুক্ত যুবককে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ—সব মিলিয়ে পুরো এলাকা কয়েক ঘণ্টা কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে কৌশলে অভিযুক্তকে ভবন থেকে বের করে থানায় নেয় পুলিশ।

সংঘর্ষের মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাউন্ড গ্রেনেডের আঘাতে আহত হন চট্টগ্রাম প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসান।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় চার বছর বয়সী এক শিশু হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। বিকেলের দিকে তাকে উদ্ধার করা হলে শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে স্বজন ও স্থানীয়দের সন্দেহ হয়, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। মুহূর্তেই খবরটি পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

বিকেল পাঁচটার পর থেকেই বিক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করেন। স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত যুবকের নাম মনির। তিনি এলাকায় একটি ডেকোরেশন দোকানে কাজ করেন। তাঁদের অভিযোগ, মনির স্থানীয়দের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকারও করেছেন।

ঘটনার পর স্থানীয়রা অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করে ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ নামের একটি ভবন ঘিরে ফেলেন।

শত শত মানুষ ভবনটির সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা ভবনের কলাপসিবল গেট ভেঙে ফেলার চেষ্টা চালায়।

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিশুটিকে পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। একই সঙ্গে অভিযুক্তকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে জনতা পথ আটকে দেয়। এ সময় পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষুব্ধ জনতা চিৎকার করে বলতে থাকে, “বাংলাদেশে বিচার নেই। ধর্ষককে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা মেরে ফেলব। তার বিচার আমরাই করবো।”

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রথমে জনতাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু উত্তেজনা বাড়তে থাকলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এরপর শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।

সংঘর্ষ চলাকালে সংবাদ সংগ্রহ ও ফেসবুক লাইভ করতে গিয়ে আহত হন সাংবাদিক মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসান। পুলিশের ছোঁড়া সাউন্ড গ্রেনেড তাঁদের গায়ে আঘাত করে।

জানা গেছে, নোবেল হাসানের হাত ও পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে। মামুন আবদুল্লাহর কোমর ও পায়ে আঘাত লাগে। আহত দুই সাংবাদিককে প্রথমে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়।

পরে তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সংঘর্ষে স্থানীয় কয়েকজন যুবকও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। অভিযুক্তকে ভবনের ভেতরেই আটকে রাখে পুলিশ। বাইরে তখন হাজারো মানুষের বিক্ষোভ। পুলিশের কয়েকটি গাড়িও আটকে দেওয়া হয়।

টানা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ‘বিসমিল্লাহ ম্যানশন’ ভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায় রাখা হয় অভিযুক্তকে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়।

রাত ১০টার পর হঠাৎ পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়রা তখনও বুঝতে পারেননি কী ঘটতে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় কৌশলে অভিযুক্তকে ভবন থেকে বের করে আনে পুলিশ। পরে তাঁকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে জনতার চোখ ফাঁকি দিয়ে বাকলিয়া থানায় নেওয়া হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, “অভিযুক্তকে থানায় আনা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

তবে অভিযুক্তকে থানায় নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। আগুনে পুড়তে থাকে গাড়িটি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থানা ঘেরাওয়ের ডাক দেয় বিক্ষোভকারীরা।

রাত ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ জনতার একটি দল বাকলিয়া থানার সামনে মূল সড়কে অবস্থান নেয়। কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালানোর ঘটনাও ঘটে। পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয়দের তোপের মুখেও পড়েন কয়েকজন সাংবাদিক। আজকের পত্রিকা-এর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আব্দুল কাইয়ুমকে একটি কমিউনিটি সেন্টারের ছাদে বেশ কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে তিনি ফেসবুকে আটকে থাকার কথা জানালে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।

গভীর রাত পর্যন্ত চেয়ারম্যানঘাটা ও বাকলিয়া থানার আশপাশ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেও বিভিন্ন সড়কে বিক্ষুব্ধ মানুষের জটলা ছিল গভীর রাত পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি