চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্পের সহায়ক অবকাঠামো।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) মঙ্গলবার (১৬ জুন) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চট্টগ্রামের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, তাদের বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
প্রকল্পে নির্মাণ করা হবে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, ৪.২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন (ডিআরএস), ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, ৬০ টন দৈনিক সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।
এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে এবং প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ সহায়তা থেকে ব্যয় করা হবে।
বৈদেশিক অর্থায়নের অংশ হিসেবে চীনের এক্সিম ব্যাংকের Preferential Buyer’s Credit (PBC) সুবিধা পাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
বেজা জানিয়েছে, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠছে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)।
এ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষরের পর শুরু হবে মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ।
সিইআইজেড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা।
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সিইআইজেডে বৃহৎ পরিসরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, শিল্পায়নের গতি বাড়বে এবং চট্টগ্রামে গড়ে উঠবে একটি আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক কেন্দ্র।
এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি কমপক্ষে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আহরণের সুযোগ তৈরি হবে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনায় এটি বিশেষ সুবিধা দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেজার মতে, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এর বিভিন্ন অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও সহায়ক হবে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একই সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও কর্মসংস্থানের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতেও সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপ-ব্যবস্থাপক সেঁজুতি বড়ুয়া জানান, মঙ্গলবার একনেকে ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে।
দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। তিনি বলেন, সরকারের কাছে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পাশাপাশি চট্টগ্রামের শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে এই প্রকল্প—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

