একটি ব্যান্ডেজ, একটি কালো হয়ে যাওয়া হাত, তারপর মৃত্যু—সাজিনাস হাসপাতাল ঘিরে নবজাতক মৃত্যুর ভয়াবহ অভিযোগে সিআইডি তদন্ত
“বাম হাতে ব্যান্ডেজ ছিল… পরদিনই আঙুল কালো”—এক নবজাতকের মৃত্যু, সাজিনাস হাসপাতালের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ
একটি ব্যান্ডেজ—পরিবারের উদ্বিগ্নে যাকে “সামান্য বিষয়” বলে আখ্যা দিয়েছিলো চিকিৎসক—সেই ব্যান্ডেজই পরদিন বদলে দেয় একটি নবজাতকের জীবনের গতিপথ।
একদিকে ছিল জন্মের আনন্দ, অন্যদিকে এনআইসিইউর ভেতরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ সংকট। আর তার শেষ পরিণতি—একটি মৃত্যু।
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার সাজিনাস হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) চিকিৎসা অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগে এক নবজাতকের মৃত্যু ঘিরে এখন আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালকসহ আট চিকিৎসক এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকজন নার্সকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) চট্টগ্রামের ৩য় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আলমগীর হোসেনের আদালতে অভিযোগটি দায়ের করেন শিশুটির মা আমাতুল মাকনুন।
আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে সিআইডিকে।
ভুক্তভোগী শিশুর মা আমাতুল মাকনুন বলেন, হাসপাতালের পরিচালকসহ সাতজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাজিনাস হাসপাতালের পরিচালক হাসান মাহমুদ চৌধুরী, সহযোগী কনসালটেন্ট (এনআইসিইউ) ডা. আনোয়ার হোসেন, সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ফয়সাল আহমেদ, পেডিয়াট্রিক সার্জন ডা. আদনান ওয়ালিদ, কার্ডিওথোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জন ডা. মো. মিনহাজুল হাসান, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হাবিবুর রহমান, কার্ডিওথোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জন ডা. মো. ফজলে মারুফ এবং ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ডা. মো. তামিম সাফায়েত চৌধুরী।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, মামলার মাধ্যমে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন এবং ঘটনার সঠিক তদন্ত হবে।
বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট শুভাশীষ শর্মা বলেন, হাসপাতালের পরিচালকসহ সাতজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আদালতে দায়ের করা অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বিচারক।
একটি প্রশ্নবিদ্ধ পরিবর্তন—ব্যান্ডেজ থেকে গ্যাংগ্রিন:
অভিযোগপত্র ও পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ২৫ মে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুটিকে শ্বাসকষ্টের কারণে সাজিনাস হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
শুরুতে শিশুটির অবস্থা স্থিতিশীল ছিল বলেই পরিবারের দাবি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। ৩০ মে শিশুটির বাম হাতে একটি ব্যান্ডেজ দেখে সন্দেহ তৈরি হয় মায়ের মনে। চিকিৎসকেরা সেটিকে “সামান্য বিষয়” বলে আশ্বস্ত করেন বলে অভিযোগ।
পরদিনই পরিস্থিতি ভয়াবহ মোড় নেয়—শিশুটির বাম হাতের নিচের অংশ কালো হয়ে যায়, আঙুলে শুরু হয় পচন (গ্যাংগ্রিন)।
পরিবার দাবি করে, তখনই তারা প্রথমবার বুঝতে পারেন, বিষয়টি সাধারণ চিকিৎসাজনিত জটিলতা নয়।
অভিযোগ: “ক্যানোলা থেকে শুরু, শেষ হয় অস্ত্রোপচারে”:
অভিযোগে বলা হয়, হাসপাতালে ব্যবহৃত আইভি ক্যানুলা ভুলভাবে স্থাপন এবং পরবর্তীতে যথাযথ নজরদারি না থাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবারের দাবি, সময়মতো বিশেষায়িত সিদ্ধান্ত না নেওয়া, দেরিতে রেফার করা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে ঢাকার ইবনে সিনা ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসকদের বরাতে নবজাতকের মা অভিযোগ করে, পূর্ববর্তী চিকিৎসায় ভুল ক্যানুলা স্থাপন ও সম্ভাব্য ভুল অস্ত্রোপচারের কারণে রক্তনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩ জুন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির আক্রান্ত হাত অপসারণ করা হয়। কিন্তু পরিবার বলে, “তখন আর অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
পরদিনই শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে—রক্তচাপ কমে যায়, শরীর ফুলে ওঠে, একাধিক অঙ্গ বিকলতার লক্ষণ দেখা দেয়। ৪ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় নবজাতকের মৃত্যু হয়।
আদালতের পদক্ষেপ ও সিআইডি তদন্ত:
শিশুটির মা আমাতুল মাকনুন আদালতে অভিযোগ দায়েরের পর বিষয়টি এখন আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় এসেছে। আদালত সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে।
এছাড়া চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে চিকিৎসা প্রটোকল, অস্ত্রোপচার সিদ্ধান্ত এবং এনআইসিইউ ব্যবস্থাপনা মূল্যায়ন করা যায়।
একটি পরিবার এখনো উত্তর খুঁজছে—কীভাবে একটি ব্যান্ডেজ থেকে শুরু হওয়া ঘটনা শেষ হলো একটি শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে?
অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার দায়, সিদ্ধান্তের সময়কাল এবং হাসপাতালের ভূমিকা—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে।
অভিযুক্ত হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের বক্তব্য:
অভিযুক্ত চিকিৎসকদের মধ্যে ডা. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তিনি বলেন, বিষয়টি একটি চিকিৎসা প্রক্রিয়ার অংশ, যা মূলত টিমওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই এককভাবে কোনো অবহেলার দায় তার ওপর বর্তায় না বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে আরেক অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. ফয়সাল আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে এই পরিস্থিতিতে “অসহায়” বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে এখন বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন নয় এবং আদালতের মাধ্যমেই সত্য উদঘাটিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে সাজিনাস হাসপাতালের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তী সময়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

