ডাস্টবিন নয়, নবজাতকের ঠাঁই হলো স্নেহের নীড়ে: আইনি প্রক্রিয়ায় পেল নতুন বাবা-মা

দুই সপ্তাহ পর পলিথিনে মোড়ানো শিশুটির মিলল নতুন সংসার

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬ ১১:৫৪

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসকে পেছনে ফেলে পলিথিনের খাঁচা থেকে উদ্ধার হওয়া সেই ফুটফুটে কন্যাসন্তানটি অবশেষে খুঁজে পেল তার নতুন ঠিকানা, পরম মমতা আর আইনি স্বীকৃতি।

ঘটনাটি গত ১৫ জুলাই ভোরের। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখীল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কোনাখালী এলাকায় এক নির্জন স্থানে পড়ে ছিল একটি পলিথিনে মোড়ানো মোড়ক।

পথচারী বা স্থানীয়দের চোখ পড়তেই উন্মোচিত হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য-পলিথিনের ভেতরে ছটফট করছে সদ্যভূমিতে আসা এক কন্যাসন্তান!

স্থানীয় এক অটোরিকশাচালক ও তাঁর পরিবার তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটিকে উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে যান।

কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত চিকিৎসক ডেকে এনে করান প্রাথমিক চিকিৎসা। পলিথিনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে বেঁচে আসা শিশুটি যেন ওই পরিবারটির কাছে বিধাতার এক অপূর্ব উপহার হয়ে ধরা দেয়।

উদ্ধারের পর থেকেই শিশুটিকে পরম স্নেহে আগলে রাখছিলেন সেই অটোরিকশাচালক ও তাঁর স্ত্রী। দিন গড়িয়ে দুই সপ্তাহ পার হতে না হতেই শিশুটির সঙ্গে গড়ে ওঠে এক আত্মিক বন্ধন।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নতুন মা-বাবা বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে আমরা শিশুটিকে দিন-রাত লালন–পালন করেছি। ও তো এখন আমাদের কলিজার টুকরা, ওর মায়ায় পড়ে গেছি। তাকে অন্য কোথাও দিয়ে দেওয়া বা ছেড়ে দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

ভাগ্যক্রমে, ওই দম্পতির ঘরে বর্তমানে পাঁচ মাস বয়সী আরও একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। ফলে নবজাতক শিশুটিকে বুকের দুধ খাওয়ানো এবং যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বেগ পেতে হচ্ছে না। যেন এক ভাইয়ের পাশাপাশি ভালোবাসার ভাগ বসাতে হাজির হলো এই পুচকে বোনটি।

শুধু আবেগ দিয়ে তো আর আইনি পরিচয় হয় না! শিশুটির ভবিষ্যৎ ও সুরক্ষার কথা চিন্তা করে পাশে দাঁড়ায় স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘মায়া সংঘ’।

সংগঠনটির সভাপতি গিয়াস উদ্দীন আকবর চৌধুরী জানান, শিশুটির উদ্ধারকারী পরিবারটিই তাকে চিরতরে নিজেদের করে নিতে গভীর আগ্রহ দেখায়। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

প্রশাসনের সবুজ সংকেতের পর গতকাল শুক্রবার এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই অটোরিকশাচালক ও তাঁর স্ত্রীর জিম্মায় হস্তান্তর করে ‘মায়া সংঘ’।

এ বিষয়ে বাঁশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানী আকন জানান, শিশুর বিষয়ে আমাকে অবহিত করা হলে আমি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিই এবং আইনানুগ পদক্ষেপের জন্য ইউএনও স্যার ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করার পরমর্শ দিই।

পলিথিনের ভেতরে যে জীবনের ইতি ঘটতে পারত, সমাজের একদল মানবিক মানুষ ও প্রশাসনের আন্তরিকতায় সেই জীবন আজ এক নতুন রাজপ্রাসাদ পেয়েছে।

হয়তো মাটির ঘর, কিন্তু হৃদয়ের বিস্তার সেখানে বিশাল। পলিথিনে কুড়িয়ে পাওয়া সেই কুঁড়িটি এখন অটোচালকের ঘরের রাজকন্যা হয়ে ডানা মেলুক, এটাই এখন বাঁশখালীবাসীর প্রার্থনা।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি