মিরসরাইয়ের উত্তর সোনাপাহাড় এলাকার সেই কালো পলিথিনটি একদিকে সমাজের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে তেমনি মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ।
যে নবজাতক কন্যাশিশুকে জন্মের পরপরই অজ্ঞাত কেউ নির্জন একটি ঘরের সিঁড়ির পাশে কালো পলিথিনটি মুড়িয়ে ফেলে রেখে গিয়েছিল, সেই শিশুটিকে ঘিরেই এখন জেগে উঠেছে মানুষের মমতা, দায়িত্ববোধ এবং ভালোবাসা।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর সোনাপাহাড় এলাকার ভোলা সওদাগর বাড়ির মীর হোসেন প্রথম দেখতে পান কালো পলিথিনে মোড়ানো একটি প্যাকেট।
ঘরটি দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে থাকায় বিষয়টি তাঁর কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। প্রথমে দূর থেকে দেখে তিনি গুরুত্ব না দিলেও পরে কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ান। প্যাকেটের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল ক্ষীণ কান্নার শব্দ। সেই কান্নাই খুলে দেয় রহস্য।
পলিথিন সরাতেই দেখা যায় সদ্যজাত একটি কন্যাশিশু। পৃথিবীর আলো দেখার পর হয়তো কয়েক ঘণ্টাও পার হয়নি তার। না ছিল পরিবারের স্নেহ, না ছিল নিরাপদ আশ্রয়। ছিল শুধু একটি কালো পলিথিন আর অজানা ভবিষ্যৎ।
মীর হোসেনের ভাষায়, “সকাল ১০টার দিকে বাড়ির সামনে একটি পলিথিনের প্যাকেট দেখতে পাই। কাছে গিয়ে কান্নার শব্দ শুনতে পাই।
পরে খুলে দেখি একটি নবজাতক শিশু। তখন আশপাশের লোকজনকে জানাই এবং দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি।”
খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় শুরু হয় চাঞ্চল্য। কেউ বিস্মিত, কেউ ক্ষুব্ধ, কেউবা আবেগাপ্লুত।
স্থানীয়দের অনেকেই বলছিলেন, একটি নবজাতককে এভাবে ফেলে যাওয়ার ঘটনা কেবল একটি শিশুর প্রতি নয়, মানবতার প্রতিও এক নির্মম আচরণ। তবে ঘটনাটির আরেকটি দিক মানুষের মনে আশা জাগিয়েছে।
প্রতিবেশী আহম্মদ উল্ল্যাহসহ স্থানীয় কয়েকজন এগিয়ে আসেন। সময় নষ্ট না করে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয় বারইয়ারহাট শেফা ইনসান হাসপাতালে। চিকিৎসকদের মতে, দ্রুত হাসপাতালে না পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারত।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এস. এ. ফারুক জানান, সকাল ১১টার দিকে শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়। প্রথমদিকে তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক না হলেও দুর্বল ছিল। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, উষ্ণতা এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জন্মের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা একটি নবজাতকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময় সঠিক পরিচর্যা না পেলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। সেই বিবেচনায় শিশুটির দ্রুত উদ্ধার হওয়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনাটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রশাসনের নজরেও আসে।
মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা শিশু কল্যাণ বোর্ডের সভাপতি সোমাইয়া আক্তার হাসপাতালে গিয়ে শিশুটিকে দেখে আসেন। তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং শিশুটির চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
সোমাইয়া আক্তার বলেন, “আমি মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালে গিয়ে শিশুটিকে দেখে এসেছি। শুনেছি প্রথমদিকে তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা খারাপ ছিল।
তবে হাসপাতালে ভর্তির পর সে ভালো আছে। উপজেলা শিশু কল্যাণ বোর্ডের সভায় শিশুটির পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।”
শিশুটিকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তার ভবিষ্যৎ।
তার পরিচয় জানা যায়নি। কে তার মা, কে তার বাবা, কী পরিস্থিতিতে তাকে এখানে ফেলে যাওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অন্ধকারে।
স্থানীয়দের ধারণা, জন্মের পরপরই অজ্ঞাত কেউ শিশুটিকে সেখানে রেখে যায়। তবে এর পেছনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও শিশু কল্যাণ বোর্ডের সদস্য সচিব সাবরিণা লীনা জানান, শিশুটির শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দরকার হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে। আর সুস্থ থাকলে জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দত্তক গ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে পরিত্যক্ত নবজাতকের ঘটনা নতুন নয়। দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ, পারিবারিক সংকট কিংবা অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ—বিভিন্ন কারণে অনেক সময় এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার পেছনে থাকে একটি শিশুর অনিশ্চিত জীবন এবং সমাজের জন্য কিছু কঠিন প্রশ্ন।
মিরসরাইয়ের এই ঘটনাও সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
একটি শিশু পৃথিবীতে আসার পর কেন তাকে নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে পলিথিনে মুড়ে ফেলে যেতে হলো? কোথায় ছিল তার পরিবারের দায়িত্ব? সমাজ কি কোনোভাবে এই পরিস্থিতি প্রতিরোধ করতে পারত?
তবে এসব প্রশ্নের মাঝেও একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—মানুষ এখনো মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
মীর হোসেন যদি কৌতূহলবশত প্যাকেটটির কাছে না যেতেন, যদি কান্নার শব্দ উপেক্ষা করতেন, যদি স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে না আসতেন, যদি চিকিৎসকেরা আন্তরিকতা না দেখাতেন কিংবা প্রশাসন দায়িত্ব না নিত—তাহলে হয়তো গল্পটির পরিণতি অন্যরকম হতে পারত।
জন্মের পরই যেখানে এক নবজাতক নিষ্ঠুর পরিত্যাগের শিকার হয়েছিল, সেখানে তাকে ঘিরে শত মানুষের মমতা আজ নতুন এক গল্প লিখছে। কালো পলিথিনের অন্ধকার পেরিয়ে সে এখন বেঁচে থাকার আলোয় এগিয়ে যাচ্ছে।
আর সেই আলোর পথেই জেগে আছে মিরসরাইয়ের মানুষের একটাই প্রার্থনা—পরিচয়হীন এই শিশুটি যেন একদিন ভালোবাসায় ভরা একটি পরিচয় খুঁজে পায়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

