গ্রাহক হয়রানি থেকে কোটি টাকার সম্পদের রহস্য, দুদকের নজরে লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ

তদন্তে দুর্নীতির ভয়ংকর চিত্র!

প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬ ১১:২৫

বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে গিয়ে মাসের পর মাস ঘুরছেন গ্রাহক। অফিসে আবেদন জমা দিয়েও মিলছে না সেবা। কখনো বলা হচ্ছে মিটার নেই, কখনো ট্রান্সফরমার নেই, কখনো আবার সার্ভিস ড্রপ বা তারের সংকট।

অথচ অভিযোগ উঠেছে, নির্দিষ্ট চক্রের কাছে গেলে কিংবা চাহিদামতো অর্থ দিতে রাজি হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তেই। সংযোগ মিলছে ‘বিদ্যুৎ গতিতে’।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসকে ঘিরে এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার অভিযোগের পরিধি ছড়িয়ে গেছে গ্রাহক হয়রানি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার পেরিয়ে সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রশ্নেও।

একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ানের বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

অভিযোগের সঙ্গে জমা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা ও সম্পদের ছবিও। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে দুদক।

অভিযোগের কেন্দ্রে একটি ‘সিন্ডিকেট’ :
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ প্রায়শই এক ধরনের অদৃশ্য প্রভাববলয়ের মুখোমুখি হন।

অফিসে গেলে তাদের বিভিন্ন অজুহাতে ঘুরানো হয়। পরে নানা মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয় তথাকথিত দালাল বা সিন্ডিকেট সদস্যদের সঙ্গে।

স্থানীয়দের দাবি, নতুন সংযোগ, বাণিজ্যিক সংযোগ, লোড বৃদ্ধি, লাইন নির্মাণ, মিটার সংক্রান্ত জটিলতা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই চক্র সক্রিয়। টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না—এমন অভিযোগও করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক গ্রাহকের আবেদন মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা হলেও প্রভাবশালী বা বিশেষ সুবিধাভোগীদের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।

এমনকি অনলাইনে জমা হওয়া আবেদনেও প্রভাব খাটিয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সংযোগের নামে অনিয়ম, সরকারের ক্ষতির অভিযোগ:
অভিযোগপত্র ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথা।

চুনতি এলাকায় আমিনুর রহমান নামে এক গ্রাহকের একই স্থাপনায় গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর নিয়মবহির্ভূতভাবে দুটি বাণিজ্যিক মিটার সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী একটি সংযোগের মাধ্যমে সেবা দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু বিশেষ সুবিধা দিতে একই স্থাপনায় দুটি সংযোগ প্রদান করা হয়। এর ফলে গ্রাহককে নিজ খরচে ট্রান্সফরমার স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং অফিস থেকে একাধিক ট্রান্সফরমার সরবরাহ করা হয়। এতে রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতির অভিযোগও রয়েছে।

একইভাবে ট্যান্ডলপাড়া এলাকার মো. আনোয়ার হোসেনের নির্মাণ সংযোগ এবং আমিরাবাদ ইউনিয়নের খালেকের দোকান এলাকার মো. ফরিদুল আলমের রাইস মিল সংযোগেও অনুমোদিত স্টেকিং শিট ও কার্যাদেশ ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যে কাজগুলো নিয়ম অনুযায়ী দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হওয়ার কথা, সেগুলোর কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে অনুমোদন ও সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত হয়েছিল, কিন্তু শাস্তি কোথায়?
লোহাগাড়া জোনাল অফিসের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর তৎকালীন জিএম প্রকৌশলী দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

সাতকানিয়া জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে আহ্বায়ক এবং এজিএম (ইএন্ডসি) মো. আজহারুল ইসলাম আবিরকে সদস্য করে তদন্ত পরিচালিত হয়।

দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে কিছু অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল।

তিনি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান। তবে পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তার জানা নেই। সূত্র-যুগান্তর

এই বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—তদন্তে সত্যতা মিললে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কেন দৃশ্যমান হয়নি?

সম্পদের পাহাড়, প্রশ্নের মুখে আয়ের উৎস :
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কয়েকজন ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ব কলাউজান এলাকায় ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান মো. সেলিমের একাধিক ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।

এর মধ্যে একটি বাণিজ্যিক ভবনের নাম ‘আহমদ হোসেন টাওয়ার’। এলাকায় তার বিভিন্ন ব্যবসায়িক বিনিয়োগের কথাও প্রচলিত রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, পল্লী বিদ্যুতের চাকরির পাশাপাশি তার মালিকানায় বা অংশীদারিত্বে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব সম্পদের উৎস নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

তবে মো. সেলিম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো দালালির সঙ্গে জড়িত নন। জমি ব্যবসাসহ বিভিন্ন বৈধ ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি সম্পদ গড়েছেন বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধেও সম্পদ অর্জন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ দুদক তদন্ত করে দেখুক। তার সব সম্পদের হিসাব রয়েছে।

অভিযুক্তদের বক্তব্য:
জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান বলেন, তিনি মাত্র এক বছর আগে ওই অফিসে যোগদান করেছেন এবং কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। বরং অফিসকে দালালমুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন।

লোহাগাড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খান বলেন, কিছু অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি অবগত আছেন। যে কোনো সংস্থা তদন্ত করলে তার কোনো আপত্তি নেই।

ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ানদের বিষয়ে তিনি জানান, তারা হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে কাজ করছেন বলে দাবি করেছেন।

এখন তাকিয়ে আছে ভুক্তভোগীরা:
লোহাগাড়ার সাধারণ গ্রাহকদের প্রত্যাশা, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অভিযোগ এবার শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কারণ বিদ্যুৎ শুধু একটি সেবা নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।

আর সেই সেবাকে ঘিরে যদি অভিযোগ, অনিয়ম ও হয়রানির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই।

এখন প্রশ্ন একটাই—দুদকের তদন্ত কি লোহাগাড়া পল্লী বিদ্যুতের অন্দরমহলের প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে পারবে, নাকি আগের মতোই অভিযোগের ফাইল হারিয়ে যাবে প্রশাসনিক গোলকধাঁধায়?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি