কার ছত্রছায়ায় গড়ে উঠল চট্টগ্রামের ‘অবৈধ কংক্রিট সাম্রাজ্য’?

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬ ২১:৩২

জরিমানা ও ভাঙচুরের দৃশ্যই শেষ দায়িত্ব। অনুসন্ধানে উঠে আসে তদারকির দুর্বলতা, আইনি জটিলতা, প্রভাবশালীদের প্রভাব এবং পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের দীর্ঘ ইতিহাস।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিশেষ টিম আজ বৃহস্পতিবার কল্পলোক আবাসিক সহ বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৫টি ভবন পরিদর্শনসাত ভবনের মালিককে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানাচারটি ভবন সিলগালা এবং অন্তত ছয়টি ভবনের অবৈধ অংশ অপসারণ করেছে।

এই অভিযানকে অনেকেই নতুন উদ্যোগ মনে করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গত এক দশকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার অবৈধ ও নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে সংস্থাটি।

কোথাও জরিমানা হয়েছে, কোথাও ভবনের অবৈধ অংশ ভাঙা হয়েছে, আবার কোথাও সিলগালা করা হয়েছে বহুতল ভবন।

কিন্তু প্রতিটি অভিযানের পরই কিছুদিনের জন্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও কয়েক মাস না পেরোতেই আবারও নতুন করে গড়ে উঠেছে নকশাবহির্ভূত ভবন।

নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষায়, এটি কেবল আইন প্রয়োগের সংকট নয়; বরং নগর ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।

কারণ অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান হয়েছে, কিন্তু অনিয়ম সৃষ্টির পথ কখনোই পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

অবৈধ ভবনের নগরীতে পরিণত হওয়ার গল্প:
চট্টগ্রাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী এবং অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। বন্দর, শিল্পাঞ্চল, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে ঘিরে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানুষের বসতি। এই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই গত দুই দশকে নগরজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বহুতল ভবন।

কিন্তু এই নির্মাণের বড় একটি অংশ হয়েছে পরিকল্পনার বাইরে। কোথাও সড়কের নির্ধারিত সীমা দখল করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও বাধ্যতামূলক সেটব্যাক রাখা হয়নি।

অনেক ভবনের চারপাশে ফায়ার সার্ভিসের প্রবেশের মতো প্রয়োজনীয় খোলা জায়গাও নেই। আবার কোথাও অনুমোদিত ছয় তলার পরিবর্তে আট বা দশ তলা পর্যন্ত নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।

চউকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা স্বীকার করেন, নগরের বিপুলসংখ্যক ভবনে কোনো না কোনো ধরনের নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

সংস্থার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনও সম্প্রতি বলেছেন, ভবন মালিকদের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অনুমোদিত প্ল্যান ও বিল্ডিং কোড পুরোপুরি অনুসরণ করেন না।

এই পরিসংখ্যান শুধু আইন ভঙ্গের চিত্র নয়; এটি নগর নিরাপত্তার জন্যও একটি অশনিসংকেত।

অভিযান যখন শেষ, তখনই শুরু হয় আইনের লড়াই :
চউকের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন হয়ে পড়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া।

অনেক ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা বা ভাঙার নির্দেশের পর ভবন মালিকেরা আদালতের দ্বারস্থ হন।

আদালতে মামলা, স্থগিতাদেশ কিংবা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক অভিযানের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। ফলে একই ভবনের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযান চালানোর ঘটনাও ঘটেছে।

চউকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনেক সময় আমরা অভিযান চালিয়ে ফিরে আসার পর আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যায়।

আইনগত জটিলতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।”

কিন্তু দায় কি শুধু ভবন মালিকদের?এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

কল্পলোক এলাকায় অভিযানের সময় একাধিক ভবন মালিক অভিযোগ করেন, নির্মাণকাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তদারকির দায়িত্ব ছিল চউকের। কিন্তু বাস্তবে অনেক নির্মাণস্থলে বছরের পর বছর কোনো পরিদর্শক যাননি।

তাদের প্রশ্ন, যদি প্রথম তলা নির্মাণের সময়ই অনিয়ম ধরা পড়ত, তাহলে কি আজ দশতলা ভবনের অবৈধ অংশ ভাঙতে হতো?

এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকারও করছেন না নগর বিশ্লেষকেরা।

তাদের মতে, নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপে কার্যকর মনিটরিং না থাকলে শুধু শেষ পর্যায়ে অভিযান চালিয়ে পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

কোথায় ভেঙে পড়ছে তদারকি?
চট্টগ্রামের নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সমস্যার শুরু নির্মাণের প্রথম দিন থেকেই।

অনুমোদিত নকশা হাতে পাওয়ার পর ভবন মালিক কী নির্মাণ করছেন, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জনবল, প্রযুক্তি এবং সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।

কিন্তু বাস্তবে চউকের পরিদর্শকসংখ্যা সীমিত, আর দ্রুত সম্প্রসারিত নগরের তুলনায় সেই সক্ষমতা অনেক কম।

ফলে অনেক নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর গিয়ে অনিয়ম চোখে পড়ে। তখন ভবন ভাঙা ছাড়া বিকল্পও অনেক সময় থাকে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জনমনে ক্ষোভও তৈরি হয়। কারণ শুরুতেই আইন কার্যকর হলে কোটি কোটি টাকার নির্মাণ ভেঙে ফেলার প্রয়োজন পড়ত না।

দুর্নীতির অভিযোগও নতুন নয়:
নগর উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা একাধিক বিশেষজ্ঞের মতে, তদারকির দুর্বলতার পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগও বহুদিনের।

যদিও প্রতিটি ঘটনায় দুর্নীতির প্রমাণ মেলে না, তবে দীর্ঘদিন ধরেই জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে—প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অর্থের প্রভাব থাকলে অনেক অনিয়ম বছরের পর বছর চোখ এড়িয়ে যায়।

এ কারণেই অভিযান শুরু হলে সাধারণ মানুষের প্রথম প্রশ্ন হয়—”এতদিন কোথায় ছিল প্রশাসন?”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দিতে না পারলে কেবল অভিযান দিয়ে জনআস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

আইনের কঠোরতা আছে, কিন্তু প্রয়োগ কতটা কার্যকর?
ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কিংবা অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ দণ্ডনীয় অপরাধ।

আইন অনুযায়ী জরিমানা, নির্মাণ বন্ধ, অবৈধ অংশ অপসারণ এমনকি প্রয়োজন হলে ভবন সিলগালার ক্ষমতাও রয়েছে।

কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের শক্তি তার শাস্তিতে নয়, বরং দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রয়োগে।

যদি কোনো ভবন নির্মাণের প্রথম পর্যায়েই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে পরে বড় ধরনের সংঘাত, ক্ষতি কিংবা আইনি জটিলতার সুযোগ অনেকটাই কমে আসে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের অভিন্ন মত—চট্টগ্রামে অবৈধ ভবন নির্মাণ ঠেকাতে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত যথেষ্ট নয়।

তাদের মতে—

  • প্রতিটি নির্মাণকাজ জিপিএস ও ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে।
  • অনুমোদিত নকশা অনলাইনে উন্মুক্ত রাখতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষও যাচাই করতে পারেন।
  • নির্মাণের প্রতিটি ধাপে বাধ্যতামূলক পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।
  • দায়িত্বে অবহেলা করলে শুধু ভবন মালিক নয়, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
  • অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করা যাবে না।

তাদের মতে, পরিকল্পিত নগর শুধু নতুন রাস্তা বা উড়ালসেতু নির্মাণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; বরং প্রতিটি ভবন নির্মাণে আইন সমানভাবে প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি নিরাপদ শহর তৈরি হয়।

২ জুলাইয়ের অভিযান নিঃসন্দেহে শক্ত বার্তা দিয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।

আজ যেসব ভবনের অবৈধ অংশ ভাঙা হচ্ছে, সেগুলোর প্রতিটি ইট বসানোর সময় কি কেউ দেখেনি? যদি দেখে থাকে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?

আর যদি কেউ না দেখে থাকে, তবে এত বড় একটি নগরের নির্মাণ তদারকি ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে—চট্টগ্রামে ২ জুলাইয়ের অভিযান একটি সাময়িক প্রশাসনিক পদক্ষেপ হয়ে থাকবে, নাকি এটি সত্যিই পরিকল্পিত নগর গড়ার নতুন সূচনা হয়ে উঠবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি