সারাদেশের ৫৬টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের ফাইল সই হয়ে গেলেও, এক রহস্যময় নীরবতা ভর করেছে চট্টগ্রামকে ঘিরে।
দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই জেলা পরিষদের অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন, কে বসছেন শূন্য চেয়ারে?
নির্বাচিত পরিষদ না থাকায় এই মূহুর্তে যিনিই চেয়ারে বসবেন, তার হাতেই ন্যস্ত হবে জেলার কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ অবকাঠামো দেখভালের সর্বময় ক্ষমতা।
আর এ কারণেই ঢাকার লবিং পাড়া থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের চায়ের টেবিল-সর্বত্র এখন হিসাব-নিকাশের ঝড়।
দলীয় ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের গুরুভার বহনে প্রথমদিকে যার নাম সবচেয়ে জোরেশোরে উচ্চারিত হয়েছিল, তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার।
কেন্দ্র থেকে তাকে এক প্রকার সবুজ সংকেত দেওয়া হলেও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি এই দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন বলে সূত্রের খবর।
আর তার এই ‘না’ এর পর থেকেই মূলত শূন্য পদের দৌড়ে যুক্ত হয়েছে একাধিক নতুন নাম, তীব্র হয়েছে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা।
তদবির এখন ঢাকায়, টেবিলে বায়োডাটার পাহাড়:
বিএনপির হাইকমান্ডের গুঞ্জন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রামের ডজনখানেক হেভিওয়েট নেতার ঠিকানা এখন ঢাকার গুলশান কিংবা পল্টন।
কেন্দ্রীয় নেতাদের মন জয় করতে জমা পড়ছে রাজনৈতিক জীবনবৃত্তান্ত বা বায়োডাটা। আন্দোলন-সংগ্রামে কার কতটি মামলা, কে কতদিন কারাবরণ করেছেন-তার খতিয়ান তুলে ধরে চলছে নীরব স্নায়ুযুদ্ধ।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় এখন প্রবীণ ও নবীনের এক মিশ্রণ।
আলোচনায় আছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম ফজলুল হক, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ আলী আব্বাস, যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল মোস্তফা আমিন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব লায়ন মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বাঁশখালীর উদীয়মান বিএনপি নেতা মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ইফতেখার মহসিন।
এছাড়াও রাজপথের বেশ কয়েকজন ত্যাগী নেতার নামও রয়েছে কেন্দ্রের বিবেচনা তালিকায়।
নেপথ্যের সমীকরণ: বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এবার কেবল ‘রাজনৈতিক পরিচিতি’ দেখে পদ বিলানো হবে না।
বিগত দিনের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সবচেয়ে বড় কথা- প্রশাসনিক দক্ষতার মতো কঠিন সব প্যারামিটার পার হয়েই আসতে হবে নতুন প্রশাসককে।
রাজনৈতিক হিসাবের বাইরেও সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয়েছে এক ধরনের উৎকণ্ঠা।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোনো শীর্ষ নেতৃত্ব না থাকায় গ্রামীণ অবকাঠামো, সড়ক-কালভার্ট সংস্কার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়ে জনসম্পৃক্ত ও দক্ষ কোনো প্রশাসক না এলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে। সরকারও চায়, এই স্পর্শকাতর জেলাটিতে এমন কাউকে দায়িত্ব দিতে, যার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত।
ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষা চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের এই নিয়োগ কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং এটি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার এক বড় পরীক্ষা।
উত্তর ও দক্ষিণ জেলার আঞ্চলিক সমীকরণ মেলাতেও হিমশিম খাচ্ছে কেন্দ্র।
শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, কিংবা ঢাকার নীতিনির্ধারকদের পকেট থেকে কার নাম বেরিয়ে আসে-তার জন্য চট্টগ্রামবাসীকে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু প্রহর।
তবে এ কথা স্পষ্ট, যিনিই আসছেন, তার জন্য ফুলের মালার চেয়ে চ্যালেঞ্জের কাঁটাঝোপই অপেক্ষা করছে বেশি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

