শ্রাবণের আকাশ ভেঙে নেমেছে বৃষ্টি। প্রকৃতির এই আশীর্বাদই এখন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের জন্য অভিশাপ।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকেই টানা ভারী বর্ষণে নগরের এক বিস্তীর্ণ অংশ রূপ নিয়েছে জলমগ্ন এক দ্বীপে।
আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পাহাড়তলী পতেঙ্গা থেকে শুরু করে কুয়াইশ-কোথাও সড়ক উধাও হয়েছে হাঁটু পানিতে, কোথাও বা কোমর সমান জল।
অথচ এই জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত বছরগুলোতে খরচ হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই সেইসব মেগা প্রকল্পের কার্যকারিতা যেন কাগজের নৌকার মতোই তলিয়ে গেল।
মঙ্গলবার সকালের কর্মব্যস্ত সময়ে যখন নগরবাসী ঘরের বাইরে পা রেখেছেন, তখনই শুরু হয় আসল পরীক্ষা।
কোথাও হাঁটু, কোথাও তার চেয়েও বেশি পানি। গণপরিবহন উধাও, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চাকা থমকে গেছে মোড়ে মোড়ে।
ফলে সৃষ্টি হয়েছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট। জীবনের তাগিদে, কিংবা চাকরি বাঁচানোর তাগিদে অনেক মানুষকে দেখা গেছে প্যান্ট গুটিয়ে, জুতো জোড়া হাতে নিয়ে নোংরা পানির মধ্য দিয়েই হেঁটে গন্তব্যে ছুটতে।
সবচেয়ে বেশি মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, কাজির হাট, হালিশহর, চান্দগাঁও, সুন্নিয়া মাদ্রাসা রোড, আকমল আলী রোড, পতেঙ্গা ও কুয়াইশ এলাকায়।
এসব এলাকার অলিগলি তো বটেই, পানি ঢুকে পড়েছে মানুষের শোবার ঘর আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে।
নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার ব্যবসায়ী করিম জানালেন, “সকালে অফিসে বের হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমাদের একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই শহরের কি কোনো অভিভাবক নেই?”
কেবল পথচারী নন, ঘরের ভেতরেও এখন আর শান্তি নেই নগরবাসীর। আগ্রাবাদ চৌমুহনভ এলাকার বাসিন্দা মিনতি বেগমের ঘরে সকালের বৃষ্টির পরপরই হু হু করে পানি ঢুকতে শুরু করে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “বাসার নিচতলায় পানি ঢুকে যাওয়ায় তাড়াহুড়ো করে আসবাবপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। এত প্রকল্পের কথা শুনি, কিন্তু জলাবদ্ধতার কোনো স্থায়ী সমাধান তো চোখে দেখছি না।”
একই চিত্র আগ্রাবাদের বাণিজ্যিক এলাকাতেও। ওখানকার ব্যবসায়ী সোবাহান মুনসীর চোখে এখন লোকসানের মেঘ।
তিনি বলেন, “দোকানে পানি ঢুকে কিছু মালামাল নষ্ট হয়েছে। বৃষ্টি হলেই আমাদের ব্যবসায় লোকসান গুনতে হয়। এভাবে কতদিন টিকে থাকা যায়?”
এদিকে দেওয়ান বাজার এাাকার বাসিন্দা লিটু নন্দী এবং অক্সিজেন এলাকার শিহাবও জানালেন কয়েক ঘন্টা ধরেই জলমগ্ন হয়ে তারা ঘরবন্দী।
তারা জানান, সকালের বৃষ্টিতে বাসার নিচতলায় পানি উঠে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে তিনি কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন। শঙ্কা প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, “মানুষের এই ভোগান্তি কবে শেষ হবে?”
স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের তীর এখন সেবা সংস্থাগুলোর দিকে। তাদের স্পষ্ট অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
সামান্য বৃষ্টিতেই যদি পুরো শহর স্থবির হয়ে পড়ে, তবে এই বিপুল অর্থের জবাবদিহিতা কোথায়? এতে শুধু চলাচলই ব্যাহত হচ্ছে না, ধস নামছে চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়।
আপাতত এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তির কোনো বার্তা নেই আবহাওয়া অফিসের কাছেও।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানিয়েছেন, গতকাল সকাল ৯টা থেকে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে রেকর্ড ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
অন্যদিকে, আমবাগান আবহাওয়া অফিসের অফিসার ইনচার্জ বিজন রায় জানান, সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে।
মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা আগামী দুই থেকে তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়ার এই পূর্বাভাসে নগরবাসীর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া হচ্ছে। মেঘ কাটবে হয়তো একসময়, কিন্তু চট্টগ্রামের এই ‘জল-জটলা’র স্থায়ী সমাধান কবে হবে,সেই উত্তর আজও অধরাই রয়ে গেল।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

