টানা পাঁচ দিনের অবিরাম ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দেশের দক্ষিণ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম। প্রমত্তা সাঙ্গু নদ যেন এখন এক রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে।
নদীটির পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে একের পর এক জনপদ। সাঙ্গুর সমান্তরালে ফুঁসে উঠেছে ডলু, টঙ্কাবতী, মাইনী ও চেঙ্গী নদীও।
নদীগুলোর স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ না থাকায় গ্রামীণ সড়কগুলোই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু পানির তীব্র তোড়ে সেই অস্থায়ী বাঁধগুলো ভেঙে উথাল-পাথাল স্রোত ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে।
ফলশ্রুতিতে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী এবং খাগড়াছড়ির সদর ও দীঘিনালা উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ এখন সম্পূর্ণ পানিবন্দী।
এর ওপর গত তিন দিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড় ও দেয়ালধসে প্রাণ হারিয়েছেন ২৯ জন। সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি এই অঞ্চলের বাসিন্দারা।
সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় ‘কোমরসমান’ জলবন্দী জীবন
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার চিত্র এখন জলমগ্ন এক দ্বীপের মতো। উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে থানা এলাকা-কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি।
গ্রামীণ হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবই এখন পানির নিচে। ১ হাজার হেক্টরেরও বেশি ফসলি জমি তলিয়ে গেছে স্রোতের পেটে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি উদ্ধার কাজের জন্য গঠন করা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক টিম।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার জানিয়েছেন এক আশঙ্কাজনক বার্তা, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা এই অঞ্চলে আরও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
‘৩০ বছরে এমন দুর্যোগ দেখিনি’: বাঁশখালীতে হাহাকার
উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের ভোগান্তি এখন চরমে। একদিকে পাহাড়ি ঢল, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের তীব্র চাপ।
এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। অধিকাংশ ঘরবাড়িতে তিন থেকে চার ফুট পানি জমে গেছে। ভেসে গেছে শত শত পুকুর ও ঘেরের মাছ।
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মাহমুদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “গত ৩০ বছরে এমন দুর্যোগ আমরা দেখিনি। আমার পুরো ইউনিয়নের রাস্তাঘাট পানির নিচে। ৮০ শতাংশের বেশি বাড়িঘর জলমগ্ন।”
আবার ছনুয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিনের কণ্ঠে ঝরে পড়ল চরম আকুতি, ”আমার এলাকা গলা পরিমাণ পানির নিচে। পানি নামছেই না।”
বাস্তুভিটা আর শেষ সম্বলটুকু পাহারা দিতে অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চাচ্ছেন না।
তবে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানিয়েছেন, ১১০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি ইতিমধ্যে সাড়ে ২৪ টন চাল দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন খাগড়াছড়ি ও সাজেক, অন্ধকারে দীঘিনালা
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি বাড়ায় একের পর এক সড়ক তলিয়ে গেছে। দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-সাজেক এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে সরাসরি যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ।
খাগড়াছড়ি শহরের নিচের বাজার, বটতলী, মহিলা কলেজ এলাকাসহ বহু নিম্নাঞ্চল এখন পানির নিচে। ঘরের ভেতর হাঁটুসমান পানি নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন শহরের বাসিন্দা আমেনা বেগমের মতো হাজারো মানুষ।
সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায়। দীঘিনালা উপজেলার ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রটি বন্যার পানিতে পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ায় বুধবার বিকেল থেকে দীঘিনালা ও পর্যটন কেন্দ্র সাজেক এলাকায় নিরাপত্তা স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
দীঘিনালা বিদ্যুৎ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী হিল্লোল বড়ুয়া জানান, বড় দুর্ঘটনা এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত। তবে এর ফলে সাজেক ও দীঘিনালার আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। মুঠোফোন চার্জ, ইন্টারনেট ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে পুরো এলাকায়।
পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্যুর মিছিল, বাড়ছে আতঙ্ক
ভারী বর্ষণের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ দেখা গেছে পাহাড়ধসে। গতকাল বুধবার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলীতে দুজন এবং আজ বৃহস্পতিবার ভোরে বান্দরবানের লামার মিশনপাড়ায় পাঁচজন মাটিচাপায় মারা গেছেন। গত তিন দিনে এই অঞ্চলে পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ জনে।
খাগড়াছড়ির শালবন, মোহাম্মদপুর, সবুজবাগ, কুমিল্লা টিলাসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত।
জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দুর্গতদের জন্য খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করছে।
এক নজরে চলমান সংকটের চিত্র
| সংকটের ক্ষেত্র | বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রভাব |
| নদী পরিস্থিতি | সাঙ্গু নদ বিপৎসীমার ১৪ সে.মি. ওপরে: ডলু, টঙ্কাবতী, মাইনী ও চেঙ্গীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি। |
| যোগাযোগ | গ্রামীণ সড়ক বিচ্ছিন্ন: দীঘিনালা-সাজেক, দীঘিনালা-লংগদু ও খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়ক বন্ধ। (তবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সচল)। |
| প্রাণহানি | গত ৩ দিনে পাহাড় ও দেয়ালধসে মোট ২৯ জনের মৃত্যু (সর্বশেষ চকরিয়ায় ২ ও লামায় ৫ জন)। |
| অবকাঠামো ও কৃষি | ১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল বিনষ্ট: ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র তলিয়ে যাওয়ায় সাজেক ও দীঘিনালা বিদ্যুৎহীন। |
| মানবিক সংকট | নলকূপ ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির তীব্র অভাব: ঘরবাড়িতে কোমরসমান পানি। |
আকাশের মেঘ এখনো কাটেনি, আবহাওয়ার পূর্বাভাসও স্বস্তির কোনো বাণী শোনাচ্ছে না।
এই মুহূর্তে পানিবন্দী লাখো মানুষের প্রধান আকুতি-একটু শুকনো খাবার, এক ঢোক বিশুদ্ধ পানি আর মাথার ওপর একটা নিরাপদ ছাদ।
প্রকৃতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই মানবিক বিপর্যয় থেকে মুক্তির কোনো সহজ পথ দেখছেন না দক্ষিণ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গত মানুষেরা।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

