টানা রেকর্ড বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ক্ষতচিহ্ন এখনো দগদগে। বিপর্যস্ত সড়ক, অচল ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর জলজটের অভিশাপ থেকে নগরবাসীকে স্থায়ী মুক্তি দিতে এবার এক টেবিলে বসেছেন চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধি ও সেবা সংস্থার শীর্ষ কর্তারা।
চট্টগ্রামের নাগরিক সমস্যা সমাধানে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের একক চেষ্টা যে যথেষ্ট নয়, সেই কঠিন সত্যকে মেনে নিয়ে এবার শুরু হচ্ছে সমন্বিত এক ‘মহাযজ্ঞ’।
নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন এবং সাম্প্রতিক রেকর্ড বৃষ্টিতে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কারের লক্ষ্যে চারটি সংসদীয় আসনভিত্তিক ‘বিশেষ সমন্বয় কমিটি’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
প্রতিটি কমিটিতে চসিক ছাড়াও সিডিএ, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সকল সেবা সংস্থার প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। মাঠপর্যায়ে দ্রুত সমস্যা চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্যই এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
শনিবার দুপুরে দামপাড়ায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন রেস্ট হাউসে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সিটি মেয়রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সভায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, আবু সুফিয়ান এবং সাঈদ আল নোমান।
সভায় সাম্প্রতিক অতিবর্ষণ, নগরীর বেহাল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা শেষে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “চট্টগ্রামের নাগরিক সমস্যাগুলো কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়।
সমন্বিত উদ্যোগই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের একমাত্র পথ। সেই লক্ষ্যেই মহানগরীর চারটি সংসদীয় আসনে আলাদা কমিটি গঠন করা হচ্ছে।”
মেয়র জানান, এই বিশেষ কমিটিগুলো সরেজমিনে ঘুরে সাম্প্রতিক রেকর্ড বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর পরিমাণ, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা, খাল-নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি নিরূপণ করবে।
এরপর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে, যা জনগণের দুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি উন্নয়ন কাজে গতি আনবে।
সভায় উপস্থিত সংসদ সদস্যরা এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহানগরীর চারটি সংসদীয় আসনকে কেন্দ্র করে পৃথক পৃথক সমন্বয় কমিটি কাজ করবে। আসনগুলো হলো: চট্টগ্রাম-৮ (বায়েজিদ–চান্দগাঁও), চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী–বাকলিয়া–ডবলমুরিংয়ের একাংশ), চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর–পাহাড়তলী–খুলশী), চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর–পতেঙ্গা–ইপিজেড)।
এই কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্য-অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এরশাদ উল্লাহ, মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান এবং সাঈদ আল নোমানের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে মাঠপর্যায়ের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করবে এবং দ্রুত সংস্কারের সুপারিশ জমা দেবে।
এক টেবিলে সব সেবা সংস্থা
চট্টগ্রামের উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার পেছনে বরাবরই আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের অভাবকে দায়ী করা হতো। তবে এবারের সভায় সেই অচলাবস্থা ভাঙার ইঙ্গিত মিলেছে।
সভায় চসিক মেয়রের পাশাপাশি উপস্থিত হয়ে নিজেদের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম এবং চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিনসহ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এই চার কমিটি কেবল সমস্যার সুপারিশ করেই খালাস পাবে না, বরং সেবা সংস্থাগুলোর কাজের নিয়মিত অগ্রগতিও পর্যালোচনা করবে।
ভাঙা রাস্তাঘাট মেরামত আর খালের গতিপথ সচল করে চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে ফিরিয়ে আনাই এখন এই সমন্বিত মিশনের মূল লক্ষ্য।
নগরের সাধারণ মানুষও এখন বুক বাঁধছেন এক নতুন ও জটমুক্ত চট্টগ্রামের আশায়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

