পাহাড়-পানির মরণফাঁদে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল: বাড়ছে লাশের সারি ও বোবা কান্না!

পানিবন্দি লাখো মানুষ, সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা প্রান্তিক কৃষক!

প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬ ১৭:১৫

টানা ছয় দিনের অবিরাম বর্ষণ। ওপর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর একের পর এক ধেয়ে আসা জীবন্ত কবরসম পাহাড়ধস। প্রকৃতির এই ত্রিমুখী আক্রমণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে দেশের অপরূপ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল

চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলার স্বাভাবিক জনজীবন আজ সম্পূর্ণ স্তব্ধ, বিপর্যস্ত। স্মরণকালের অন্যতম নিকৃষ্টতম এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে।

যেখানে চোখ যায়, শুধু পানি আর মানুষের বেঁচে থাকার আকুল আকুতি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ।

প্রাণহানির পাশাপাশি ঘরবাড়ি, কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামো খাতে নেমে এসেছে অপূরণীয় ক্ষতি। দুর্গতদের রক্ষায় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা সাধ্যমতো লড়লেও, লাখো মানুষের সম্মিলিত আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে এই অঞ্চলের আকাশ-বাতাস।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান যেন এক একটি মৃত্যু আর ধ্বংসের দলিল।

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রলয়ংকরী এই দুর্যোগে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় এ পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। পাহাড়ের মাটিচাপায় কিংবা বন্যার তোড়ে ভেসে গিয়ে হারিয়ে গেছে তাদের তাজা প্রাণ।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ২৩ জন, যার মধ্যে ১৩ জনই আশ্রিত রোহিঙ্গা।

এছাড়া প্রমত্তা চট্টগ্রামে ১১ জন, পাহাড়ি কন্যা বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্যোগের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে ছটফট করছেন আরও ৩৯ জন আহত মানুষ।

পুরো বিভাগে কমবেশি ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল চট্টগ্রাম জেলাতেই দুর্গত মানুষের সংখ্যা সাড়ে ৬ লাখের বেশি, যা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা প্রমাণ করে।

বাস্তুচ্যুত ও পানিবন্দি মানুষদের রক্ষা করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৭২৭টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

ঘরবাড়ি হারিয়ে, ঘরের চালের ওপর কিংবা গাছের ডালে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের এনে রাখা হচ্ছে এসব কেন্দ্রে। বর্তমানে সেখানে ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন।

বিপন্ন এই মানুষদের মুখে অন্ন তুলে দিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯১ মেট্রিক টন চাল, প্রায় ৯১ লাখ টাকা এবং ৩৪ হাজার প্যাকেটের বেশি শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি জেলার গুদামে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল, নগদ টাকা ও শিশু খাদ্য মজুত রাখা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এই সাহায্য যেন সাগরে এক ফোঁটা জলের মতো।

বন্যা ও অতিবৃষ্টির ফলে সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় নেমে এসেছে কৃষি খাতে। যে মাটির দিকে তাকিয়ে কৃষক বুক বেঁধেছিলেন, সেই মাটি এখন কর্দমাক্ত পানির নিচে।

বিভাগের ৫ জেলায় আউশ ধান, আমন বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি ও পান বরজসহ প্রায় ১৮ হাজার ৯৩৩ হেক্টর ফসলি জমি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যায় কেবল আউশ ধানেরই ক্ষতি হয়েছে ১২ হাজার হেক্টরের বেশি জমি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই বিশাল ক্ষতি দেশের ধানের বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কক্সবাজার ও রাঙামাটির হাজার হাজার প্রান্তিক কৃষক এই বন্যায় তাঁদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে আজ পথের ফকির হয়ে গেছেন। তাঁদের চোখের জল যেন বন্যার পানির চেয়েও নোনতা।

অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখলে শিউরে উঠতে হয়। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে এই বিভাগের জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়ক মিলিয়ে মোট ২৪১ কিলোমিটার সড়ক সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সড়ক যোগাযোগ প্রাথমিকভাবে সচল করতেই অন্তত ৩৪ কোটি টাকা এবং স্থায়ী মেরামতে ২১০ কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে, নবনির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে আপাতত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। কালুরঘাট ব্রিজের কাছে প্রায় ৪০০ মিটার রেললাইন দেড় ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে।

তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ রবিবার থেকেই এই লাইনে পুনরায় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

দুর্যোগের এই সার্বিক পরিস্থিতি সরাসরি তদারকি করতে এবং বিদ্যুৎ ও ত্রাণ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে ঢাকা থেকে বন্যাকবলিত এলাকায় ছুটে এসেছেন সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আদিত্য ইসলাম অমিত এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন।

তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি দুর্গত ও বানভাসি মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন।

প্রতিমন্ত্রীদ্বয় দুর্গতদের আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার এই কঠিন সময়ে দেশের দুর্গত মানুষের পাশে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে রয়েছে। যতক্ষণ না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে, ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চলবে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণে আমাদের টিম কাজ করছে।

বন্যা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে এবং পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির এই আর্থিক পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও সাধারণ মানুষের পুনর্বাসনে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে জরুরি সমন্বয় সভা করা হয়েছে এবং দ্রুতই পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হবে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি