আবাসিক ভবনে হাসপাতাল, পার্কিং বদলে তৈরি হয়েছে দোকানপাট ও ওয়াশিং প্ল্যান্ট। নকশা অনুযায়ী চারপাশের খোলা জায়গা দখল করে নির্মিত হয়েছে ভবন, আর জরুরি ফায়ার এক্সিটের সিঁড়িতে জমে আছে ময়লার স্তূপ।
চট্টগ্রামের একাধিক বেসরকারি হাসপাতালের ভেতরের চিত্রটি এমনই করুণ।
তাছাড়া রোগী ও তাদের স্বজনদের পার্কিংয়ের জায়গা নেই, অথচ চিকিৎসকদের গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দখল করে রাখছে মূল চত্বর। ফলে ব্যস্ত সড়কের ওপর তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
এমন অনিয়ম ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিরুদ্ধে এবার সরাসরি মাঠে নেমেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদিবাগ ও পাঁচলাইশ এলাকার পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল পরিদর্শনে যান সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের টিম।
অভিযানে অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে নগরীর পাঁচ হেভিওয়েট হাসপাতালকে সতর্ক করার পাশাপাশি পরিস্থিতি শুধরাতে এক মাসের আল্টিমেটাম দিয়েছেন সিডিএ চেয়ারম্যান।
কোন হাসপাতালে কী পাওয়া গেল?
সিডিএর সরেজমিন অভিযানে বড় ৫ হাসপাতালের চূড়ান্ত গাফিলতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এরমধ্যে-
ন্যাশনাল হাসপাতাল: কাগজে-কলমে ৫০টি গাড়ির পার্কিং থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে মেলে মাত্র ২৮টির জায়গা। বাকি জায়গা দখল করে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা অপ্রতুল হওয়ার পাশাপাশি জরুরি ফায়ার সিঁড়িতে দেখা গেছে বর্জ্যের স্তূপ।
ম্যাক্স হাসপাতাল: সাধারণ রোগীদের গাড়ি রাখার জায়গা না থাকলেও পার্কিংয়ের বড় একটি অংশ দখল করে রাখা হয়েছে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামো দিয়ে।
এরিস্ট্রোকেয়ার হাসপাতাল: মূল ভবনটি গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে। হাসপাতাল পরিচালনার জন্য নেই কোনো ‘ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র’। মূল নকশার ব্যাপক বিচ্যুতি এবং পার্কিং ব্যবস্থার সংকট এখানে স্পষ্ট।
ইপিক হাসপাতাল (তিনটি শাখা): সবচেয়ে মারাত্মক অনিয়ম মেলে এই প্রতিষ্ঠানে। নকশাবহির্ভূত লিফট নির্মাণ, ড্রাইভওয়ে না রাখা, পার্কিংয়ের জায়গায় বাণিজ্যিক দোকান ভাড়া দেওয়া এবং অগ্নিনিরাপত্তার চরম ঘাটতি থাকায় এর এক্সটেনশন ভবনের কার্যক্রম দ্রুত বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পপুলার হাসপাতাল: নির্ধারিত ৪০ ফুট খোলা জায়গা দখল করে ভবন প্রসারণের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরেকটি ভবনের অনুমোদিত নকশাই দেখাতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
পরিদর্শন শেষে সিডিএ চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হাসপাতাল অত্যন্ত জনসংবেদনশীল ও জনসমাগমপূর্ণ একটি জায়গা। সেখানে পার্কিং, অগ্নিনিরাপত্তা ও ভূমিকম্প সহনশীলতা নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং বাধ্যতামূলক।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, রোগীদের জন্য কোনো পার্কিং নেই, অথচ চিকিৎসকদের গাড়ি দীর্ঘ সময় পুরো পার্কিং এলাকা দখল করে রাখে। এই চিত্র আর চলবে না।
পার্কিং এলাকার কোনো স্থানে স্থাপনা রাখা যাবে না। চিকিৎসকদের গাড়ি শুধু নির্দিষ্ট প্রয়োজনে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করবে-এমন নিয়ম চালু করতে হবে।
তিনি আরও জানান, কেবল হাসপাতাল প্রাঙ্গণই নয়, সড়ককে সচল রাখতে হাসপাতালগুলোর সামনের অপ্রয়োজনীয় ইউ-টার্ন বন্ধ করা এবং যান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের সাথে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কঠোর বার্তার মুখে হাসপাতালগুলো
নগরীর যানজট নিরসন এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে নিরাপদ করতেই সিডিএ এই অভিযান চালিয়েছে। পরিদর্শন শেষে আগামী সোমবার (আগস্টের প্রথম কর্মদিবস) সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর মালিক ও কর্তৃপক্ষকে অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রসহ যাবতীয় নথি নিয়ে সিডিএ কার্যালয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জনস্বার্থ বিবেচনা করে অনিয়ম শুধরে নেওয়ার জন্য আপাতত এক মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সিডিএ চেয়ারম্যান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এক মাসের মধ্যে যদি দৃশ্যমান ও সন্তোষজনক অগ্রগতি না দেখা যায়, তবে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে।
এখন দেখার বিষয়, সেবা দেওয়ার নামে ভবন ও পার্কিং নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই ফাঁকি সিডিএর আল্টিমেটামে সত্যি বন্ধ হয় কি না।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

