সীতাকুণ্ডে বাস উল্টে যুবকের মৃত্যু,চাকরির পরীক্ষার সকালে হাসপাতালের বেডে অর্পিতা!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬ ১৪:১২

রোববার সকাল সাড়ে সাতটা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিরা ইলিয়াস পেট্রলপাম্প এলাকা প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ত হয়ে উঠছিল। কেউ ফিরছিলেন কর্মস্থলে, কেউ যাচ্ছিলেন জরুরি প্রয়োজনে।

২০ বছর বয়সী তরুণী অর্পিতা সাহার চোখেও ছিল রঙিন স্বপ্ন-আজ তাঁর চাকরির পরীক্ষা। মাসের পর মাস টেবিল ল্যাম্পের আলোয় করা প্রস্তুতিকে বাস্তবে রূপ দিতেই তিনি চড়েছিলেন চট্টগ্রাম থেকে নোয়াখালীগামী ‘জোনাকী পরিবহন’ নামের একটি বাসে

কিন্তু বেপরোয়া গতির ঘূর্ণিপাকে মুহূর্তেই বদলে গেল সব দৃশ্যপট। পরীক্ষার হলের বদলে অর্পিতার স্থান হলো হাসপাতালের ঠান্ডা বিছানায়, আর ‘প্রকাশ’ নামের এক যুবকের জীবনের গল্প চিরতরে থেমে গেল বাসেরই ধ্বংসস্তূপে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জোনাকী পরিবহনের বাসটি শুরু থেকেই মহাসড়কে বিপজ্জনক গতিতে চলছিল।

কুমিরা ইউনিয়নের ইলিয়াস পেট্রলপাম্পের কাছে পৌঁছামাত্র চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। বাসটি প্রচণ্ড গতিতে সড়ক বিভাজকের (ডিভাইডার) সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বিকট শব্দে উল্টে যায়।

বাসটি উল্টে যাওয়ার পর যাত্রীরা গাড়ির ছাদ এবং ইঞ্জিনের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ অংশে আটকা পড়েন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার সময় বাসের উচ্চ গতি এবং আকস্মিক উল্টে যাওয়ার ফলে তৈরি হওয়া প্রচণ্ড বল (Impact Force) যাত্রীদের ছিটকে এক জায়গায় জড়ো করে ফেলে, যা তাঁদের বের হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়।

কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে না পৌঁছালে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।

এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি হলো ৩০ বছর বয়সী যুবক প্রকাশের মৃত্যু। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে যখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তাঁর নাম প্রকাশ বলে জানা গেলেও, দুর্ঘটনার পর তাঁর বিস্তারিত পরিচয় মেলেনি। কর্মসংস্থান বা পারিবারিক প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া এই যুবক হয়তো কোনো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন, যিনি আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবেন না।

অর্পিতার ভাঙা স্বপ্ন ও হাসপাতালের আর্তনাদ

দুর্ঘটনার অন্য এক মানবিক অধ্যায় অর্পিতা সাহা। চমেক হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে যখন অর্পিতা হাত ও পায়ের মারাত্মক জখম নিয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন, তখন তাঁর চেয়েও বেশি রক্তাক্ত হচ্ছিল তাঁর বাবার মন।

অর্পিতার বাবা বাসুদেব সাহা বলেন, মেয়েটা আজ কত আশা নিয়ে চাকরি পরীক্ষা দিতে নোয়াখালী যাচ্ছিল। কিন্তু পথেই সব শেষ হয়ে গেল।

অর্পিতার এই জখম শুধু তাঁর শরীরে নয়, তাঁর ক্যারিয়ার এবং একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্নের ওপরও বড় আঘাত।

অর্পিতা ছাড়াও এই দুর্ঘটনায় একই পরিবারের সদস্যসহ ৫জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

তাঁরা হলেন, রওশন আক্তার (৩৮), তাঁর ছোট ভাই মহিউদ্দিন (৩৩), মোহাম্মদ মান্নান (৩০), তাঁর স্ত্রী সোনিয়া আক্তার (২৫) এবং আরিফ মো. ইউসুফ (৫১)।

বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিল্টন মণ্ডল জানান, বাসটি উল্টে যাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার কাজ চালানো হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের মতে, সীতাকুণ্ডের এই অংশটি মহাসড়কের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা ‘ব্ল্যাকস্পট’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে।

সকালের দিকে রাস্তা ফাঁকা থাকায় দূরপাল্লার বাসগুলোর চালকরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে গতি বাড়িয়ে দেয়।

গতিসীমা লঙ্ঘনের এই সংস্কৃতি এবং চালকদের অসচেতনতাই এই রোববারের সকালটিকে রক্তাক্ত করে তুলেছে।

মহাসড়কে আর কত অর্পিতার স্বপ্ন ভাঙবে? আর কত প্রকাশকে পরিচয়হীন লাশ হয়ে হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকতে হবে?

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তুলে স্থানীয়দের প্রশ্ন?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি