কাগজে-কলমে সব ঠিকঠাক, কিন্তু কায়িক পরীক্ষা চালাতেই বেরিয়ে এলো থলের বিড়াল!
পণ্যের নামে জালিয়াতি আর প্রতিষ্ঠানের ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা সাড়ে ১৭ টন পণ্যের একটি চাঞ্চল্যকর চালান আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)।
ঘোষণা ছিল সুস্বাদু পান মশলা, জর্দা আর চোখধাঁধানো প্রিন্টেড পেপার ক্যাটালগের। কিন্তু গত ২৭ সেপ্টেম্বর কায়িক পরীক্ষার সময় কনটেইনার খুলতেই গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের চোখ ছানাবড়া।
পান মশলার বদলে মিলল কেজির পর কেজি ধোঁয়াটে তামাকজাত সামগ্রী এবং হরেক রঙের সন্দেহজনক পাউডার! অন্যদিকে ক্যাটালগের বদলে নামল বস্তা বস্তা ফেলে দেওয়া স্ক্র্যাপ পেপার।
ঘটনার শুরু ‘এমভি উদ্দিপন এক্সপ্রেস’ নামের জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়াকে কেন্দ্র করে।
কলকাতা থেকে দুটি হাউজ বিল অব ল্যান্ডিংয়ের (বি/এল) মাধ্যমে আসা ২ হাজার ৪০টি প্যাকেজে মোট ১৭ হাজার ৫১৩ দশমিক ৪ কেজি পণ্যের এই চালানটি বন্দরে এসে পৌঁছায়। কিন্তু গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সিআইআইডি কর্মকর্তারা কায়িক পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথম হাউজ বি/এল (ঘোষণা: পান মশলা ও জর্দা): ৪৭৩ প্যাকেজে ৮ হাজার ৯৭৪ কেজি পণ্য আমদানির কথা বলা হয়েছিল। কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া যায় ৪৭০ প্যাকেজে ৮ হাজার ২৫০ দশমিক ৪ কেজি তামাক বা তামাকসদৃশ সামগ্রী।
শুধু তা-ই নয়, এই তামাকের চালানেই চোখ আটকে যায় কর্মকর্তাদের। এতে পাওয়া গেছে বিভিন্ন রঙের সন্দেহজনক পাউডারজাত পদার্থ। এসব পাউডারে কোনো মাদক বা নিষিদ্ধ উপাদান লুকিয়ে আছে কি না, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র রহস্য।
দ্বিতীয় হাউজ বি/এল (ঘোষণা: প্রিন্টেড পেপার ক্যাটালগ): ১ হাজার ৫৭০ প্যাকেজের চালানটি পরীক্ষা করতেই ভেসে ওঠে বিপুল পরিমাণ পরিত্যক্ত ময়লা কাগজ।
৯ হাজার ২৬৩ কেজি (প্রায় ৯.২৬ টন) স্ক্র্যাপ পেপার এনে মূলত একটি বড় ধরনের অর্থ পাচার বা শুল্ক ফাঁকির পাঁয়তারা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘আমি তো কিছুই জানি না!’-প্রতিষ্ঠানের মালিকের দাবি:
সবচেয়ে বড় চমক অপেক্ষা করছিল আমদানিকারকের নথিপত্রে। চালানের নথিতে স্পষ্ট অক্ষরে আমদানিকারক হিসেবে নাম লেখা ‘অথয় এন্টারপ্রাইজ’। কিন্তু কাস্টমস গোয়েন্দারা যোগাযোগ করলে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সম্পূর্ণ বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, এই চালানের বিষয়ে তিনি বা তার প্রতিষ্ঠান বিন্দুবিসর্গও জানেন না।
কোনো অসাধু চক্র তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম, ট্রেড লাইসেন্স ও আইআরসি সংক্রান্ত গোপন তথ্য চুরি করে জালিয়াতির মাধ্যমে চালানিটি দেশে এনেছে।
রহস্যের জট খুলতে ল্যাব পরীক্ষা ও সিআইআইডির তদন্ত:
উদ্ধার হওয়া রহস্যময় রঙিন পাউডারজাত পদার্থগুলো এখন বিশেষজ্ঞদের আতশকাঁচের নিচে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে এগুলো ক্ষতিকারক বা নিষিদ্ধ কোনো রাসায়নিক কি না।
এ ঘটনার পেছনে আসল কারিগর কারা? কোন আন্তর্জাতিক চক্র অন্যের নথিপত্র ব্যবহার করে এ ধরনের পণ্য আমদানি করছে এবং ক্যাটালগের নামে কেনই-বা এত বিপুল পরিমাণ বাতিল কাগজ আনা হলো-এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইতোমধ্যে অলআউট তদন্তে নেমেছে সিআইআইডি।
চট্টগ্রাম বন্দরে এমন অভিনব ছকে পণ্য আমদানির ঘটনা কাস্টমস অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


